এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ বেড়েছে, বর্ষার আগে হচ্ছে জরিপ। লার্ভিসাইডিং, ফগিং ও ক্র্যাশ প্রোগ্রামের পাশাপাশি চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি। এত কর্মযজ্ঞের পরও বর্ষার শেষপ্রান্তে এসে দেখা যাচ্ছে সেই উল্টো চিত্র। এডিসের বংশবিস্তার থামছে না, ফলে হু হু করে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে হাজার হাজার রোগী, ভারী হচ্ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জনের। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৫৯৩ জন ডেঙ্গু রোগী; মারা গেছে সাতজন।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসব্যাপী দেশব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। কিন্তু নতুন কর্মসূচির শুরুতেই পুরনো প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। তা হলোÑ এত পরিকল্পনা, এত অর্থ, এত জরিপ ও এত অভিযান সত্ত্বেও কেন থামছে না ডেঙ্গু? ব্যর্থতা কোথায়Ñ পরিকল্পনায়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে, জনসম্পৃক্ততায়, নাকি রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা ব্যবস্থায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশক নিধন অভিযান যথেষ্ট নয়। এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসে ধারাবাহিক উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সময়মতো চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। প্রতিরোধ ও চিকিৎসাÑ দুই দিকেই সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকলে একের পর এক কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু শুধু মশার বিস্তার কিংবা রোগীর সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। রোগী কত দ্রুত শনাক্ত হচ্ছে এবং সংকটাপন্ন হওয়ার আগেই চিকিৎসার আওতায় আসছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শুধু শেষ মুহূর্তে আইসিইউ কিংবা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঠেকানো যাবে না। রোগী সংকটাপন্ন হওয়ার আগেই তাকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হবে। প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও আগাম রোগ শনাক্তকরণে জোর দিতে হবে।
Manual4 Ad Code
তার মতে, ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে জ্বরের রোগী শনাক্ত করে দ্রুত পরীক্ষা করানো যেতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশু, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে সেকেন্ডারি হাসপাতাল বা স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। রক্তচাপ ও সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে অবস্থার পরিবর্তন নজরে রেখে অবনতি হলে দ্রুত বড় হাসপাতালে পাঠানো গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর চাপও কমবে। অর্থাৎ ডেঙ্গু মোকাবিলায় শেষ মুহূর্তের চিকিৎসার পাশাপাশি আগাম শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও সময়মতো স্থানান্তরÑ সবকিছুকেই একই ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
রোগী কমানোর প্রথম শর্ত মশা কমানো। কিন্তু মশক নিয়ন্ত্রণে বছরের পর বছর অভিযান চললেও জরিপে মিলছে উল্টো চিত্র। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রাক-বর্ষা জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতে মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মাত্রার ওপরে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড ছিল চরম ঝুঁকিতে। ২ হাজার ২৫০টি বাড়িতে চালানো জরিপে ২৮১টি স্থাপনায় পাওয়া যায় এডিসের লার্ভা বা পিউপা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আগস্টের জরিপে বান্দরবানের মতো এলাকাতেও মশার ব্রুটো ইনডেক্স (বিআই) ৪০-এর বেশি পাওয়া গেছে। এডিসের প্রজননস্থল যেহেতু মানুষের বাড়িঘর ও আশপাশে, তাই জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, সরকারি ও উন্মুক্ত স্থান, রাস্তা, নালা ও জনপরিসরের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে নিতে হবে। আর নিজেদের বাসাবাড়ি ও আঙিনা লার্ভামুক্ত রাখার দায়িত্ব জনগণের। দুই পক্ষের কাজ একসঙ্গে না হলে কোনো একক উদ্যোগেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
জনসম্পৃক্ততার কথা প্রতিবছর পরিকল্পনায় থাকলেও তা কতটা নিয়মিত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি উঠে আসছে ব্যয়ের কার্যকারিতার বিষয়টিও। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশক নিয়ন্ত্রণে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। এ সময়ে ঢাকা উত্তরের বার্ষিক বরাদ্দ ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ; দক্ষিণের ১১ কোটি ৫০ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তারপরও প্রশ্ন থাকেÑ এত অর্থ ব্যয়ের পর মশার ঘনত্ব কতটা কমেছে? কতগুলো প্রজননস্থল স্থায়ীভাবে ধ্বংস হয়েছে? অভিযানের পর কোথায় আবার লার্ভা পাওয়া গেছে? কোন পদ্ধতি কার্যকর, কোনটি নয়? কারণ অভিযান হয়েছেÑ এটি সাফল্যের মাপকাঠি নয়। সাফল্য মাপতে হবে অভিযানের পর মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুর হার কতটা কমেছে, তা দিয়ে।
Manual5 Ad Code
Manual6 Ad Code
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীর সংকট নয়। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১৩ হাজার ৯৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছে ৪২ হাজার ৬৬ জন। বিভাগ ভিত্তিক হিসাবে খুলনায় ৮ হাজার ৯৬৩, বরিশালে ৭ হাজার ৮৬৮, চট্টগ্রামে ৭ হাজার ৯২৯ এবং ময়মনসিংহে ৩ হাজার ৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রাজধানীর বাইরে রোগ শনাক্তকরণ, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় ঝুঁকিও বেশি।