বড় শহরের বাইরে দ্রুত বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের চেহারা। কৃষিজমি ও জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠছে বহুতল আবাসিক ভবন, কারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বড় শহরের বাইরে দ্রুত বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের চেহারা। কৃষিজমি ও জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠছে বহুতল আবাসিক ভবন, কারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। পর্যাপ্ত রাস্তা, ড্রেনেজ, পয়োনিষ্কাশন ও অগ্নিনিরোধের ব্যবস্থা না থাকায় বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও অগ্নিঝুঁকি। ভবন, রাস্তা ও খোলা জায়গার সমন্বয়হীনতা তৈরি করছে নতুন সংকট। এ অবস্থায় গ্রাম ও মফস্বলের নির্মাণকাজে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে নতুন কাঠামো তৈরি করছে সরকার।
নতুন ব্যবস্থায় গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ভবন অনুমোদনের দায়িত্ব যাবে উপজেলা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন বা বিসি কমিটির কাছে। সাততলার বেশি ভবনের নকশা অনুমোদন ও কারিগরি তদারকির দায়িত্ব থাকবে জেলা বিসি কমিটির হাতে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নীতি, বিধি, লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ (বিবিআরএ)। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল পাস হওয়া বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ আইনের লক্ষ্য নির্মাণ খাতে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। দেশে বিএনবিসি-২০২০ থাকলেও এতদিন জাতীয় পর্যায়ে সব ধরনের নির্মাণ তদারকির জন্য একক শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছিল না। নতুন কর্তৃপক্ষ সেই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে।
Manual8 Ad Code
গত ২৫ জুন জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে বিবিআরএ আইনের ১১ ধারার অধীনে জেলা ও উপজেলা বিসি কমিটি গঠনের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা বিসি কমিটি হবে এই ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও আইনি হাতিয়ার।
Manual7 Ad Code
Manual3 Ad Code
জেলা কমিটির সভাপতি থাকবেন জেলা প্রশাসক এবং সদস্য সচিব হবেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী। উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সদস্য সচিব হবেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলী। এসব কমিটিতে গণপূর্ত, ফায়ার সার্ভিস, ভূমি প্রশাসন, পুলিশ, স্থাপত্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।
কমিটির দায়িত্ব শুধু নকশা অনুমোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্মাণকাজের সময় অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, ভবনের নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা ঠিক আছে কি না এবং নির্মাণ শেষে ভবনটি ব্যবহার উপযোগী হয়েছে কি না— এসবও তদারকির আওতায় থাকবে।
পৌরসভা ও গ্রামীণ এলাকায় পৃথক অনুমোদন কাঠামো
পৌর এলাকার ক্ষেত্রে সাততলা পর্যন্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনের নকশা অনুমোদনের বিদ্যমান পৌর বিসি কমিটির ব্যবস্থা থাকবে। তবে পৌরসভার বাইরে গ্রাম ও ইউনিয়ন এলাকায় একই সীমার ভবনের অনুমোদন দেবে উপজেলা বিসি কমিটি। সাততলার বেশি ভবনের ক্ষেত্রে উপজেলা বা পৌরপর্যায়ে অনুমোদনের সুযোগ থাকবে না। এসব ভবনের কারিগরি অনুমোদনের চূড়ান্ত দায়িত্ব যাবে জেলা বিসি কমিটির কাছে।
পৌর বিসি কমিটির বিদ্যমান ভূমিকা বাতিল হচ্ছে না। জেলা কমিটি তাদের সিদ্ধান্তের সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। জেলা কমিটিতে সংশ্লিষ্ট পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সদস্য রাখা হয়েছে, যাতে পৌর ও গ্রামীণ নির্মাণ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকে।
অনুমোদিত নকশা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি বা বিএনবিসি লঙ্ঘন ধরা পড়লে জেলা বা উপজেলা কমিটি ব্যবস্থা নিতে পারবে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সুযোগও থাকবে। ১৯৫২ সালের ভবন নির্মাণ আইনের ১২ ধারার আওতায় অবৈধ অংশ অপসারণসহ তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সাততলার সীমাটিও ঝুঁকি বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবনের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে মাটির ভারবহন ক্ষমতা, ভিত্তির নকশা, কাঠামোর স্থায়িত্ব, ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও দুর্যোগঝুঁকি যাচাইয়ের প্রয়োজন বাড়ে। উপজেলা পর্যায়ে সাধারণত প্রকৌশলীর সংখ্যা সীমিত। বিশেষায়িত পরীক্ষাগার বা কাঠামোগত যাচাইয়ের সুযোগও সব জায়গায় নেই। তাই জটিল ও উচ্চ ভবনের নকশা যাচাই জেলা পর্যায়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জেলা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ডিজাইন জোন এবং পরিকল্পনা ও নকশা শাখার কারিগরি সহায়তা নিতে পারবেন।
অনুমোদন থেকে ব্যবহার— তিন ধাপে তদারকি
Manual1 Ad Code
নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়াকে তিন ধাপে দেখছে সরকার। প্রথম ধাপে স্থাপত্য, কাঠামো, বৈদ্যুতিক ও প্লাম্বিং নকশার অনুমোদন দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে নির্মাণকাজের সময় অনুমোদিত নকশা, সেটব্যাক, এফএআর, উপকরণের মান ও নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারক করা হবে। সর্বশেষে সরেজমিন পরিদর্শনের পর দেওয়া হবে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা ব্যবহার অনুমতিপত্র। এই সনদ নিশ্চিত করবে, ভবনটি অনুমোদিত নকশা ও প্রযোজ্য নিরাপত্তাবিধি মেনে নির্মিত হয়েছে কি না।
নির্মাণ অনুমোদনের সঙ্গে জমির ব্যবহারও যুক্ত হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে পাস হওয়া স্থানিক পরিকল্পনা আইন-২০২৬ কৃষিজমি, জলাধার ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ ঠেকাতে সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার কাঠামো দিয়েছে। ফলে শুধু ভবনের নকশা ঠিক থাকলেই হবে না; ভবনটি কোথায় হচ্ছে, আশপাশের রাস্তার প্রশস্ততা, খোলা জায়গা, পানি নিষ্কাশন ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না— এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসবে। পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়, সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ পরিবেশবান্ধব নির্মাণে উৎসাহ দিতে গ্রিন বিল্ডিং সনদের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
৪৯৫ উপজেলায় গণপূর্তের কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনা
এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুল রহমান বলেন, গ্রামীণ এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ এবং কৃষিজমি বাঁচিয়ে পরিকল্পিত নগরায়ণ করতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানিক পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরায়ণ হচ্ছে কি না, উপজেলা কমিটি যৌথভাবে তা মনিটরিং করবে। এতে কারিগরি সহায়তায় গণপূর্তের প্রকৌশলীরাও যুক্ত থাকবেন।
মূলত অতিরিক্ত কোনো বাজেট বা পদ ছাড়াই নিজস্ব ২ হাজার ৬৮৩ জন প্রকৌশলী ও কর্মচারীকে পুনর্বিন্যাস করে ৪৯৫ উপজেলায় গণপূর্তের কার্যক্রম বিস্তারের প্রস্তাবটি এখন প্রাক-নিকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই পরিকল্পনার বড় ভিত্তি হচ্ছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপজেলা পর্যায়ে বিস্তার।
গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরওয়ার জাহান জানিয়েছেন, প্রতিটি উপজেলায় কাঠামো বিস্তারের প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। নতুন রাজস্ব পদ সৃষ্টি না করে বর্তমানে ঢাকা ২ হাজার ৬৮৩ জন প্রকৌশলী ও কর্মচারীকে পুনর্বিন্যাস করে ৪৯৫ উপজেলায় জনবল ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৯ জুন এ বিষয়ে পাঁচ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। ৬ জুলাইয়ের বৈঠকে বিদ্যমান জনবল ব্যবহার করে বিস্তারের সিদ্ধান্ত হয়। ৭ আগস্ট প্রস্তাবটি প্রাক-নিকারের অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রতিটি উপজেলায় উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের কারিগরি দল রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে জেলা থেকে প্রকৌশলীদের উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে তদারকি করতে হয়। এতে সময় ও যাতায়াতের চাপ বাড়ে এবং নিয়মিত নজরদারি ব্যাহত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রকৌশলী থাকলে সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি বেসরকারি নির্মাণ ও দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন, কমিটি ও জনবল বাড়ালেই অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ হবে না। মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে প্রভাবশালী জমির মালিক, ঠিকাদার ও স্থানীয় ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে একই নিয়ম ব্যবস্থা নেওয়া। নতুন কাঠামো যদি অনুমোদন, কাগজপত্র ও পরিদর্শনের নামে আরেক স্তরের হয়রানি তৈরি করে, তাহলে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে পারে। জেলা ও উপজেলা কমিটিকে প্রতি তিন মাসে কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রতিবেদন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।
এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গ্রামাঞ্চলে এখন শুধু সাধারণ বসতবাড়ি নয়; বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও কারখানা ও হচ্ছে। তাই পরিকল্পনার অনুমোদন, প্রকৌশলগত নিরাপত্তা, দুর্যোগঝুঁকি ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় বিসি কমিটির নজরদারি জরুরি। তবে নগরের আমলাতান্ত্রিক হয়রানি ও ঘুষের সংস্কৃতি যেন গ্রামেও ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, সাধারণ মানুষ নিরাপদ ভবন করতে নিয়ম মানতে আগ্রহী। সেই নিয়ম মানার প্রক্রিয়াও হতে হবে স্বচ্ছ, সহজ ও ঘুষমুক্ত।