প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৪ঠা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ
অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ

Manual3 Ad Code

 

Manual6 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

দেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়া। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ খাতের সবচেয়ে বড় এই ‘গলার কাঁটা’ অর্থনীতিতে ঘটিয়ে চলেছে অদৃশ্য ও নিস্তব্ধ রক্তক্ষরণ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির ৯৭ শতাংশই এই ক্যাপাটিসি চার্জ পরিশোধে ব্যয় হয়। গত পাঁচ অর্থবছরে এই চার্জ বাবদ সরকারের খরচ হয়েছে এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো অন্তত পাঁচটি সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

Manual2 Ad Code

 

এই বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতি বছর লোকসান গুনছে। সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। এর জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ভ্রান্ত নীতি এবং বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে দায়ী করেন তারা।

 

উল্লেখ্য, দেশে মোট চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। চাহিদা না থাকায় অনেক কেন্দ্রই অলস বসে থাকে। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল থাক বা না থাক, কিংবা সেখান থেকে সরকার বিদ্যুৎ কিনুক বা না কিনুকÑ চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটিকে বিশাল অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে হয়। একেই ক্যাপাসিটি চার্জ বলে। পিডিবি চুক্তি অনুযায়ী সেগুলোকে নিয়মিত ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নামে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এই ধরনের অসম ও অন্যায্য চুক্তি করে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিবছরই খরচ বাড়ছে। ক্যাপাসিটি চার্জ এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি এ খাতে দুর্নীতি এবং অদক্ষতার কারণেও উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অর্থ ও জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় দশকে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরিশোধ করা বিল ১১ গুণ বাড়লেও ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। অর্থ সংকটের কারণে সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে ক্যাপাসিটি চার্জ এখন সরকারের জন্য গলার কাঁটা বা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৭ হাজার থেকে ২৮ হাজার মেগাওয়াট (আমদানিসহ)। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা কখনো ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ফলে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা অলস পড়ে থাকে। অথচ সরকারকে ঠিকই প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা। এর পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৫ হাজার কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খরচ হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। লক্ষণীয়, এই ব্যয় প্রতিবছর বাড়ছে।

 

ক্যাপাসিটি চার্জ কেন ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে

Manual6 Ad Code

বিশেষজ্ঞদের মতে, চারটি কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ সরকারের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে। প্রথমত : অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করা হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার সঠিক মূল্যায়ন না করেই অলস বসে থাকা রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত : জ্বালানি সংকট। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হলেও সেগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস বা কয়লা আমদানির টাকা নেই। ফলে কেন্দ্রগুলো তৈরি থাকার পরও জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ ঠিকই পাচ্ছে। তৃতীয়ত : পর্যাপ্ত ডলারের অভাব। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৫টি। এর মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল ৬৮টি। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগ ক্যাপাসিটি চার্জ ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ডলারে এই পেমেন্ট দিতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। চতুর্থত : গ্রাহক পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি। পিডিবির লোকসান কমাতে সরকার বারবার খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ম তামিম বলেন, ‘অনেক অলস বিদ্যুৎকেন্দ্র বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। এটি তো হতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। আবার অনেক সময় অর্থের অভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনা যাচ্ছে না। ব্যয়বহুল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম কমানোর যথাযথ পথ নয়। ফলে এগুলো ঠিক করতে হবে। তাহলেই দেখা যাবে, এ খাতে সরকারের ব্যয় অনেকটাই কমে গেছে।’ তিনি মনে করেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা আছে, চুরি আছে। আছে অব্যবস্থাপনাও। এগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই।’

 

সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতকে এই ‘গলার কাঁটা’ থেকে মুক্ত করতে হলে নতুন বা পুরনো সব চুক্তিতে পরিবর্তন এনে নিয়ম করতে হবেÑ বিদ্যুৎ দিলে টাকা পাবে, অলস বসে থাকলে কোনো ভাড়া পাবে না। যেসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ, সেগুলোর সঙ্গে আর কোনো চুক্তি নবায়ন না করে সরাসরি বন্ধ করে দিতে হবে। বিদেশি ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ) প্রসার ঘটাতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের অর্থায়নের ক্ষেত্রে টানাপড়েন চলছে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ে বিশাল দুর্বলতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে।’ তিনি মনে করেন, ‘অবিলম্বে চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি যেসব কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সেগুলো আর নবায়ন না করে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তা না হলে অর্থনীতি আরও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।’

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে বাড়তি কেন্দ্রভাড়া ধরে চুক্তি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পটপরিবর্তনের পর এসব বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনায় ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একটি কমিটি করে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে গত ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওই কমিটি। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও এর অপব্যবহারকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি। উচ্চ হারের এই কেন্দ্রভাড়া কমানোর জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দ্রুত নতুন করে দর কষাকষি করা এবং যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে সেখানে সরাসরি চুক্তি বাতিল করা প্রয়োজন বলে মনে করে পর্যালোচনা কমিটি।

Manual3 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code