দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক অভাবনীয় রূপান্তরের ক্রান্তিকাল পার করছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর একক নির্ভরতার সীমাবদ্ধতাগুলো এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের চরম অস্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর অস্বাভাবিক চাপ, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পরিবেশগত ঝুঁকিÑ সব মিলিয়ে একটি টেকসই বিকল্পের সন্ধান এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ঠিক এই বাস্তবতা সামনে রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেবল ‘পরিবেশবান্ধব বিকল্প’ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করছে নতুন সরকার।
সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সচিব সভায় ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ নিয়ে অত্যন্ত বিশদ ও গভীর আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভাটি ছিল নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের বেশি সময় পর সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং সচিবদের নিয়ে প্রথম বৃহত্তর সম্মিলন। আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয় থাকলেও, এই বৈঠকে সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা, প্রশাসনের কাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে কাজের সমন্বয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সৌরবিদ্যুতের প্রসারের বিষয়টি।
Manual3 Ad Code
Manual6 Ad Code
আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি ও উৎপাদনে বৈচিত্র্যের আবশ্যকতা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের মজুদ ক্রমশ ফুরিয়ে আসায় আমদানিনির্ভরতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি বা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যে সামান্য রদবদল হলেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে তার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, অথচ নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য আনা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। বড় আকারের মেগা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন ব্যবস্থাকে কাজে লাগাতে পারলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রচলিত জ্বালানির ব্যবহার রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে; বরং বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে নবায়নযোগ্য উৎসের একটি সুপরিকল্পিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সংমিশ্রণ তৈরি করাই বর্তমান কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য।
রুফটপ সোলারে নতুন সম্ভাবনা ও প্রায়োগিক কৌশল
সচিব সভায় রুফটপ সোলারের (ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ) বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তব কারণ রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে কৃষি ও বাসযোগ্য জমি বাঁচিয়ে মেগা সৌরপ্রকল্পের জন্য হাজার হাজার একর নতুন জমি অধিগ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব। অথচ দেশের শহর ও শিল্প অঞ্চলগুলোতে সরকারি-বেসরকারি ভবন, তৈরি পোশাক খাতের বিশাল কারখানা, গুদাম, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর ছাদে বিপুল পরিমাণ জায়গা অব্যবহৃত পড়ে আছে। এই ‘ডেড স্পেস’ বা অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনশীল খাতে পরিণত করার মোক্ষম হাতিয়ার হলো রুফটপ সোলার।
যেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, ঠিক সেখানেই যদি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা যায়, তবে সঞ্চালন বা ট্রান্সমিশন লস (সিস্টেম লস) শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত অংশ ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপরও চাপ কমবে। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে শুধু প্যানেল বসানোই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন, প্যানেলের প্রযুক্তিগত মান নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রাহকদের জন্য আকর্ষণীয় আর্থিক প্রণোদনার একটি সমন্বিত প্যাকেজ প্রয়োজন।
সক্ষমতার বড় পরীক্ষা গ্রিডের আধুনিকায়ন
সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সরাসরি সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দিনের বিভিন্ন সময়ে এর উৎপাদনে ব্যাপক ওঠানামা হয়। ফলে প্রচলিত বেইস-লোড বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নবায়নযোগ্য এই পরিবর্তনশীল উৎসকে কার্যকরভাবে মেলাতে হলে জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থার আমূল আধুনিকায়ন বা ‘স্মার্ট গ্রিড’ প্রযুক্তি অপরিহার্য। সচিব সভায় এই বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, সেই বিদ্যুৎ ধারণ ও বিতরণের জন্য গ্রিডের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। পিক ও অফ-পিক আওয়ারের (চাহিদার ওঠা-নামা) মধ্যে ভারসাম্য রাখতে উন্নত প্রযুক্তির ‘এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম’ বা ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। আধুনিক গ্রিড, উন্নত সঞ্চালন লাইন ও স্মার্ট বিতরণব্যবস্থা ছাড়া উৎপাদিত নবায়নযোগ্য শক্তির বড় একটি অংশই অপচয় হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
Manual4 Ad Code
সাশ্রয় ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ
নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে উৎপাদন বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার ও অপচয় রোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অফিস থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও আবাসিক এলাকায় জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে অনেক বেশি মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই বিশাল রূপকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা কেবল সরকারি কোষাগার থেকে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। এখানে দেশি-বিদেশি বেসরকারি খাতের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আর বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক নিশ্চয়তা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পুরোপুরি দূর করতে হবে।
কাগজের কৌশল থেকে মাঠের বাস্তবায়ন
নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন কোনো একটি একক মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অর্থ, পরিবেশ, ভূমি, শিল্প ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখানে রয়েছে। একটি মন্ত্রণালয় নীতি গ্রহণ করলেও ভূমি অধিগ্রহণে দেরি বা অর্থায়নের অভাবে প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকার নজির দেশে অসংখ্য। এ কারণে দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট বণ্টন, সময়সীমা নির্ধারণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। সচিব সভায় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়ানোর ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সফলতার জন্য তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আগামীর রূপরেখা
২০২৬-৩০ সময়কালের এই কৌশলপত্রটি কেবল একটি খসড়া দলিল নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণের একটি দিকনির্দেশনা। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার পাশাপাশি আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির বিল পরিশোধের চাপ কমবে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশের অর্থনীতি সুরক্ষা পাবে।
পরিশেষে বাংলাদেশের অর্থনীতি যত প্রসারিত হবে; শিল্প, কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ প্রতিটি স্তরে বিদ্যুতের চাহিদাও তত জ্যামিতিক হারে বাড়বে। আজকের সচিব সভার আলোচনা প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এখনই একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে চাইছে। অর্থ, প্রযুক্তি ও সমন্বয়ের ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কৌশলপত্রটি যদি সফলভাবে মাঠে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।