নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঘিরে সারা দেশে বাড়ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। এই নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। হঠাৎ করেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে খন্ড খন্ড মিছিল করে নিজেদের সক্ষমতা জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে তিনদিন আগে গুলশানে বড় একটি মিছিল নিয়ে বেশ চাপে পড়েছে পুলিশ। এই নিয়ে সরকারের হাইকমান্ডও ক্ষুব্ধ হয়েছে।
Manual7 Ad Code
মিছিলের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে খুনাখুনি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধও বেড়ে গেছে। বিভিন্ন কৌশল নিয়েও নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। এসব কারণে চলতি মাসেই পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদলের পরিকল্পনা আছে সংশ্লিষ্টদের। ইতিমধ্যে একাধিক চৌকস পুলিশ কর্তার আমলনামা যাচাই-বাছাই হচ্ছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নতি করতে সর্বশেষ গত ররিবার পুলিশ সদর দপ্তরের পাশাপাশি ডিএমপির সদর দপ্তরেও বিশেষ বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানকে কড়া ভাষায় বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের কোনো মিছিল ঠেকাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিসহ তার ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নেওয়া হবে। প্রতিটি থানায় রাত এবং দিনে টহল বাড়াতে হবে। মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিরা সমন্বয় করে বৈঠক করে অপরাধীদের ধরার পাশাপাশি সার্বিক বিষয়ে নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন। এতে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিক অন্যত্র বদলিরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মাঠ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা : পুলিশ সূত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিল ঘিরে চাপে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশানে কয়েকশ নেতাকর্মীর মিছিল বের হওয়া, পুলিশের বাধার মুখে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি এবং পরে ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনায় মাঠপর্যায়ের পুলিশি তৎপরতা ও গোয়েন্দা সমন্বয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এরই মধ্যে রাজধানীর থানাগুলোকে আরও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো এলাকায় এ ধরনের মিছিল বা অপতৎপরতা ঠেকাতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। মিছিল চলাকালে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কিছুটা আতঙ্কও দেখা দিয়েছে। মিছিলের জন্য শতাধিকের বেশি মানুষ কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জড়ো হওয়ার আগে স্থানীয় থানা, গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরের পূবাইল থানাধীন টেকপাড়া, সোবানি রিসোর্টের পেছনের রাস্তায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ২৫-৩০ জন সমর্থক মিছিল করে। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোড এলাকায় সাবেক যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে পৃথক দুটি ঝটিকা মিছিল হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকেই মাঠপর্যায়ে দলটির তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব ঘটনার পর সারা দেশের থানার ওসিদের সতর্ক করা হয়েছে।
Manual3 Ad Code
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যাতে ঢাকায় মিছিল কিংবা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সতর্ক আছে পুলিশ। প্রতিটি থানায় বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া আছে। রাস্তায় টহল, তল্লাশি ও অভিযান বৃদ্ধি করা হয়েছে।
Manual4 Ad Code
দুর্বলতার সুযোগে হচ্ছে মিছিল : আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যাপক অপতৎপরতা চালাচ্ছে। তারা হাসিনার প্রত্যাবর্তনের দাবি করে সরকারবিরোধী আওয়াজ তুলছে। দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে দলটি ষড়যন্ত্রের ছক আঁকছে। এতে পুলিশের গাফিলতিও আছে। পুলিশের টহলে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। আছে গোয়েন্দা ব্যর্থতাও। এই সুযোগে আওয়ামী লীগ সারা দেশে ঝটিকা মিছিল করার সাহস পাচ্ছে। গত রবিবার ডিএমপির সদর দপ্তরে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ডিএমপি কমিশনার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ অরাজকতা করার চেষ্টা করলেই কঠোর অ্যাকশনে যেতে হবে। কোনো ধরনের কার্যক্রম চালানো বা ঝটিকা মিছিল হলে তার দায়দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্লিষ্ট জোনের ঊর্ধ্বতনদের। কোনো অবস্থাতেই অপরাধীদের দিকে শিথিলতা দেখানো যাবে না। টহল ও চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সিটিটিসি ও ডিবিতে কর্মরত সদস্যদের ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে হটস্পটগুলোতে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করতে ‘এআই’-চালিত সিসি ক্যামেরা ও ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম প্রবেশমুখগুলোতে নজরদারি করতে বলা হয়েছে।
আগাম তথ্যের ঘাটতি : পুলিশ সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ মাঠে তৎপরতা দেখানোর চেষ্টা করছে। যেকোনো ধরনের নাশকতা রুখে দিতে পুলিশ দফায় দফায় বৈঠক করেছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) প্রায়ই ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করছেন। দিচ্ছেন নানা নির্দেশনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মিছিল ও খুনাখুনি বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আগাম তথ্যর ঘাটতি থাকার কথা বলা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ এসেছে। আরও বলা হয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের পুলিশের সমন্বয়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মসূচির তথ্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে থাকলেও তা যদি দ্রুত স্থানীয় থানায় না পৌঁছায়, তাহলে আগাম প্রতিরোধ করাও কঠিন হওয়ার বিষয়ে পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তা মত দিয়েছেন। মাঠ পর্যায়ের পাশাপাশি ঊর্ধ্বতনদের জবাবদিহির আওতায়ও আনতে বলা হয়। কোনো এলাকায় মিছিল হলে শুধু অংশগ্রহণকারীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ আগে থেকে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, সেটিও মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। শুধু ঢাকায় কঠোরতা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও একই ধরনের নজরদারি বাড়াতে বলা হয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও দ্রুত করা, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, থানাভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিকভাবে মূল্যায়ন করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতেই হবে।
কঠোর অ্যাকশনে যাওয়ার প্রস্তুতি : তিনটি জেলা পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশানুযায়ী কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যাতে মিছিল করতে না পারে, সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে বৈঠক হচ্ছে। মিছিল করার চেষ্টা করলেই অ্যাকশনে যাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া রাত থেকেই বাসাবাড়ি ও মেস, হোস্টেল ও আবাসিক হোটেলে একযোগে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে থানা পুলিশ ও গোয়েন্দাদের। পাশাপাশি যেকোনো ধরনের আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন (আইএডি) গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মিছিলের স্থানসহ নেতৃত্ব দেওয়া নেতাকর্মীদের একটা তালিকা করা হয়েছে।
সরকারে হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার পর থেকেই পুলিশের ওপর সরকারের উচ্চপর্যায়ে থেকে প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকার পরও কীভাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এভাবে একযোগে মিছিল করতে পারল, সে বিষয়ে কড়া জবাব চাওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগের মিছিল ও আইনশৃঙ্খলার কিছুটা অবনতি হওয়ায় আমরা চাপের মধ্যে আছি। এতে সরকারের হাইকমান্ডও ক্ষুব্ধ। ইতিমধ্যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজনকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষ বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি পুলিশে বড় ধরনের রদবদল হওয়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভালো করতে।
পুলিশের ভেতরেই হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা : সার্বিক বিষয় নিয়ে পুলিশের ভেতরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপের মুখে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরছেন। তাদের মতে, আগে থেকে সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও নজরদারি বাড়িয়ে মিছিল শুরু হওয়ার আগেই তা পণ্ড করে দেওয়া সম্ভব হতো। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল কারণ গোয়েন্দা তথ্যের চরম ঘাটতি। আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক গতিবিধি ও কৌশল সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে পর্যাপ্ত আগাম তথ্য মিলছে না। কেবল নিজস্ব সূত্রের ওপর নির্ভর করে সারা দেশে একই সময়ে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য আগাম জোগাড় করা পুলিশের পক্ষে সম্ভবও হচ্ছে না।