সকাল থেকে সন্ধ্যা। রাজধানীর বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরে রোগীর ঢল। এসব হাসপাতালে নামি চিকিৎসক বসেন। ফি তুলনামূলক চড়া। দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা আসেন। রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর মধ্যে অন্যতম। রোগীসেবা ও পরিচিত চিকিৎসকদের উপস্থিতির আড়ালে এসব মেডিকেল কলেজের একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ফ্লোর স্পেস, হাসপাতালের শয্যা ও একাডেমিকসংকটের মধ্যে চলছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। বেহাল অবস্থার মধ্যে শিক্ষার্থীরা কী শিখছেন আর কেমন চিকিৎসক হবেন, সে প্রশ্ন তো রয়েছেই।
বর্তমানে দেশে ৬৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। প্রতিবছর ৬ হাজার ২৭৮টি আসনে ভর্তি হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। পড়া শেষ করতে লাগছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। কিন্তু এসব কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত রোগী। ওয়ার্ডে কাজ করা, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ, প্রসূতি, শিশু, মেডিসিনসহ বিভিন্ন বিভাগে বাস্তব প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন সীমিত কলেবরে। বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন আইন, ২০২৩ করা হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে এখন পর্যন্ত কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাক্রিডিটেশন পায়নি বলে জানা গেছে।
Manual7 Ad Code
পপুলার মেডিকেল কলেজ
স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। ফ্লোর স্পেসের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষকদের হোস্টেল সুবিধাও নেই। আছে শিক্ষকসংকট। এর মধ্যেই চলছে পপুলার মেডিকেল কলেজ। একটি মেডিকেল কলেজ পরিচালনায় যতটা ফ্লোর স্পেস দরকার, তার প্রায় অর্ধেক নেই ধানমন্ডিতে অবস্থিত এই হাসপাতালটিতে। রয়েছে শয্যাসংকটও। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘বড় চিকিৎসকদের’ চেম্বার থাকে রোগীতে পরিপূর্ণ। তবে হাসপাতালের শয্যায় পর্যাপ্ত রোগী না পেয়ে এই কলেজের শিক্ষার্থীরা কেমন চিকিৎসক হবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
মেডিকেল শিক্ষায় ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু পপুলার মেডিকেল কলেজের অধিকাংশ বিভাগেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। অধিকাংশ বিভাগ চলছে লেকচারার দিয়ে। এসব বিভাগ কার্যত অলংকৃত করছেন মাত্র একজন অধ্যাপক। কলেজটির একাধিক বিভাগ রয়েছে, যেখানে একজন শিক্ষকও পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পপুলার মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি, নিউরোলজি, হেপাটোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারলোজি, ভাইরোলজি, কার্ডিওলোজি বিভাগে একজন শিক্ষক নেই। ট্রান্সফিউশন মেডিসিনে রয়েছেন মাত্র একজন অধ্যাপক। তবে কোনো সহযোগী, সহকারী ও লেকচারার পদে কাউকে পাওয়া যায়নি। এনাটমি বিভাগে ১৩ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র একজন। একই অবস্থা ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফরেনসিক মেডিসিন, কমিউনিটি মেডিসিন, মাইক্রোবাইলোজি ও ফার্মাকোলজি বিভাগে। এসব বিভাগে ৭-১১ জন শিক্ষক রয়েছেন, কিন্তু অধ্যাপক মাত্র একজন।
কলেজটির মেডিসিন বিভাগে সবচেয়ে বেশি শিক্ষক রয়েছেন মেডিসিন বিভাগে। ২০ জন শিক্ষক বিভাগে অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে অর্ধেকই লেকচারার। এই বিভাগে অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র ৬ জন। সার্জারি বিভাগে ১৭ জন কাজ করলেও লেকচারারের সংখ্যা ১১ জন। অধ্যাপকের সংখ্যা ৪ জন।
শুধু শিক্ষকসংকট নয়, কলেজটির একাডেমিক ভবনের ফ্লোর স্পেসের ঘাটতি ৯৪ হাজার বর্গফুট। হাসপাতালের ফ্লোর স্পেস ঘাটতি ১৪ হাজার বর্গফুট।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ
সংকটের মধ্যেই চলছে শ্যামলীতে অবস্থিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ। জমির ঘাটতি, হাসপাতালের শয্যা ঘাটতি, ফ্লোর স্পেসের সংকট ও শিক্ষকসংকটের মধ্য দিয়ে চলছে বেসরকারি এই মেডিকেল কলেজটি। অন্য বেসরকারি কলেজের মতো এই কলেজটিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই বললেই চলে। কলেজটির আসনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশও নেই। স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, কলেজটির ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগে শিক্ষকসংখ্যা শূন্য।
একই অবস্থা রিউমেটালজি, রেসপিরেটরি মেডিসিন, হেমাটোলজি, অনকোলজি, শিশু সার্জারি, নিউনেটোলজি বিভাগে। এসব বিভাগে একজনও শিক্ষক নেই। ফিজিক্যাল মেডিসিন ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিও চলছে শিক্ষক ছাড়া। নেফ্রোলজি বিভাগে একজন অধ্যাপক আছেন। কিন্তু কোনো সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক নেই। নেই লেকচারারও। মেডিসিনে ৯ জন থাকলেও অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র ২ জন। পেডিয়াট্রিক্সে ৫ জনের মধ্যে অধ্যাপক একজন। কার্ডিওলোজিতে মাত্র একজন অধ্যাপক আছেন। অন্য কোনো শিক্ষক নেই। অর্থোপেডিক্সে ২ জনের মধ্যে একজন অধ্যাপক ও একজন লেকচারার।
মেডিকেল কলেজের নামে ১০০ শতক জমি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও রয়েছে ৯৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। কলেজটিতে ২০ হাজারের বেশি ফ্লোর স্পেস ঘাটতি আছে। আসনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য স্থায়ী আমানত ও ফ্লোর স্পেসের ঘাটতি আছে।
Manual4 Ad Code
আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ
এই কলেজটিতেও শিক্ষক ঘাটতি ও ফ্লোর স্পেস ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে একটি ভবনের তিনটি ফ্লোরে মেডিকেল কলেজ কার্যক্রম চলছে। আশপাশে একটি ভবনের দুটি ফ্লোর একাডেমিক কাজের জন্য কেনা হয়েছে। এর পরও কলেজ কার্যক্রমের জন্য ২৪ হাজার বর্গফুট ফ্লোর স্পেস ঘাটতি আছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মেডিকেল কলেজের আরও ৬টি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর পরও ২৪ হাজারের বেশি ফ্লোর স্পেসের সংকট রয়েছে। মেডিকেল কলেজ স্থাপন নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ২৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক থাকতে হবে। কিন্তু এনাটমি বিভাগে একজন, ফিজিওলোজি বিভাগে দুজন, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে তিনজন, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগে সাতজন, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে নয়জন শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া প্যাথলজি বিভাগে ছয়জন, মাইক্রোবায়োলজিতে সাত, ফার্মাকোলজিতে ছয়, মেডিসিনে দুই, সার্জারিতে পাঁচ শিক্ষকের ঘাটতি আছে।
কলেজটির লাইব্রেরিতে রেফারেন্স বুক ও জার্নালের ঘাটতি রয়েছে। লাইব্রেরিতে আসনসংখ্যা ও পরিসর বাড়ানোর পরামর্শ স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়েছে। কলেজটিতে পর্যাপ্ত টিউটোরিয়াল ল্যাব ও হলরুম নেই। স্টেপআপ প্যাটার্ন ও ক্লাসরুমগুলো প্রতিধ্বনি প্রতিরোধী করতে বলা হয়েছে।
Manual1 Ad Code
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) ডা. মুহাম্মদ আবদুল কাদের বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিই। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়। ব্যবস্থা যে একেবারেই নেওয়া হয় না, এটি বলা যাবে না।’