সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে সরকারি অর্থে প্যানেল বসানো হচ্ছে, কিন্তু নষ্ট হওয়ার পর তা সচল রাখার দায়িত্ব যেন কারও নেই। কোথাও শিলাবৃষ্টিতে একটি প্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছে, কোথাও পুরো ব্যবস্থাই বন্ধ। নতুন করে প্যানেল বসাতে হলে আবার অর্থ লাগবে; অথচ সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ বা দেখভালের জন্য আলাদা কোনো বাজেট নেই। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা অল্প সময়েই পরিণত হচ্ছে অকেজো যন্ত্রপাতিতে।
Manual4 Ad Code
এ অবস্থার কথা স্বীকার করেন সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংস্কার এবং সংরক্ষণের বিষয়ে আলাদা বরাদ্দ থাকা উচিত। সৌরবিদ্যুৎ একটি বিনিয়োগ, অবশ্যই এর একটি সুনির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল রয়েছে। এই আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার আরও আগে যদি প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু সেটি করা হয় বলে মনে হয় না।
Manual2 Ad Code
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) গবেষণাগারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য তিন বছর আগে বসানো হয়েছিল ১০ কিলোওয়াটের সৌর প্যানেল। গত বছর শিলাবৃষ্টিতে এর একটি প্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিআরআরআইকে জানায়, সেটি অপসারণ করে নতুন প্যানেল বসাতে হবে; তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত প্যানেলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। গোল বাঁধে এখানে। নতুন প্যানেল বসানো বা সংস্কারের জন্য অর্থের সংস্থান না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সৌর প্যানেলটি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। অন্যগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। বিআরআরআইতে সাত বছর আগে প্রশাসনিক ভবনে স্থাপন করা ৫ কিলোওয়াটের আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও এখন পুরোপুরি বন্ধ।
বিআরআরআইয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান আলীর কাছে জানতে চাইলে বলেন, একবার নষ্ট হওয়ার পর আর ঠিক করার মতো কোনো বাজেট ছিল না। বাজেট না থাকায় ঠিক করা হয়নি। এখন সোলার প্যানেলটি পড়ে আছে।
গবেষণাগারের ওপর লাগানো সৌর প্যানেলটির বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরআরআইয়ের উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, একটি প্যানেল শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বাজেট না থাকায় আমরা সেটি বদলাতে পারিনি। ক্ষতিগ্রস্ত প্যানেলে সংযোগ দিলে শর্টসার্কিট হয়ে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। যেহেতু বরাদ্দ নেই, তাই ওই প্যানেলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অন্যগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
বিআরআরআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন হাল হলে সরকারি পয়সায় যেসব জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ বসানো হয়েছে, সেসব জায়গার খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক জায়গার চিত্র একই রকম।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ ইউএনওর অফিসে ৩০ কিলোওয়াটের একটি সৌর প্যানেল ২০১৩ সালে বসিয়ে দেয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। বসানোর চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এটি অকেজো হয়ে পড়ে।
Manual6 Ad Code
ইউএনও হিল্লোল চাকমা বলেন, তাদের এখানে সোলার প্যানেলগুলো রয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে কোনো কাজ হয় না। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে। সম্প্রতি এই সোলার প্যানেলটির বিষয়ে জানতে চেয়ে তারা স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে চিঠি পাঠিয়েছেন।
ইউএনওর পাঠানো তথ্যের সূত্র ধরে এই সোলার সিস্টেমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইলেক্ট্রো সোলার পাওয়ার লিমিটেডকে খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, তারা আর এই ব্যবসাতেই নেই। ধরন বদলে তারা অন্য ব্যবসা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে পাওয়া ফোন নাম্বর থেকে যোগাযোগ করা হলে প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম জানান, সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পেতে হলে দক্ষ প্রয়োজনীয় লোকবল থাকতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান সোলার সিস্টেম বসাবে, তাকেই এই জনবল নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে সোলার সিস্টেম অকেজো হওয়া স্বাভাবিক। তিনি এখন মোংলা বন্দরের তড়িৎ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন উল্লেখ করে বলেন, আমরা বন্দরে ৬০০ কিলোওয়াটের সোলার সিস্টেম বসিয়েছি, যা থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনিও মনে করেন, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না করে সোলার সিস্টেম বসানো উচিত নয়।
Manual3 Ad Code
সুনামগঞ্জের আরেক উপজেলা শাল্লায় ৫০০ পরিবারকে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য একটি সোলার মিনিগ্রিড স্থাপন করা হয়েছিল। জলবায়ু উন্নয়ন তহবিল থেকে এই অর্থায়ন করা হয়। এখন কী অবস্থায় রয়েছে জানতে চাইলে শাল্লার ইউএনও পিয়াস চন্দ্র দাশ বলেন, ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে সেটি পড়ে রয়েছে। সেই ৫০০ পরিবারের বিদ্যুতের কী অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্প্রতি শুনেছি কয়েকটি পরিবারকে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভায়ও জলবায়ু উন্নয়ন তহবিলের টাকায় বসানো হয়েছিল সৌরবাতি। ঢাকাতেও এমন বাতি বসানো হয়েছিল। বাতিগুলো এখন জ¦লে কি না জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোশারফ হোসেন জানান, সেগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এই অবস্থার মধ্যেই চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা ফের ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়েছে হাটে, মাঠে-ঘাটে সৌর প্যানেল বসানোর জন্য। শুধু চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা নয়, এমন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে।
এর আগে টিআর এবং কাবিটার টাকায় ২০১৮ সালে ২৭১ কোটি টাকা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বরাদ্দ করা হয়। যার মধ্যে ১৩৩ কোটি টাকাই সোলার হোম সিস্টেমে বরাদ্দ করা হয়। এ ছাড়া মিনি গ্রিড, সোলার সেচ পাম্পে পৃথক বরাদ্দ ছিল। আগে একসময় ত্রাণ নিতে গেলে চাল, গমের মতো খাদ্যপণ্য দেওয়া হতো। ওই বছর ত্রাণের বদলে সোলার প্যানেল দেওয়া হতো। যার অধিকাংশই ছিল নিম্নমানের। আবার সাধারণ মানুষের কারিগরি জ্ঞান না থাকায় এগুলো তেমন কাজে আসেনি। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন কর্মকর্তা বলছেন, সরকারের ইচ্ছায় অনেক কিছু বাধ্য হয়ে করতে হয়। সৌর প্যানেলে অতীতে এমন যাচ্ছেতাই খরচার পর যেখানে বেশিরভাগ অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে, এখন আবার একই প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নেই। কিন্তু যেভাবে হচ্ছে তা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। তারা বলছেন, একটি সৌর প্যানেল ২৫ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার আগে অবশ্যই সরকারিভাবে কোথায় কোথায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা যাচাই-বাছাই করতে হবে। এসব জায়গা থেকে কতটা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা উচিত।
জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, সরকারি অর্থের অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় লোকের সুবিধা তৈরি করতে এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বিগত সময়ে টিআর/কাবিটার টাকায় সৌরবিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে কি না, কেউ কোনো দিন খবর নেয়নি। বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য সোলার সংযোগ প্রয়োজন হতো। মানুষ প্যানেল ভাড়া নিয়ে ছাদে বসাত। এরপর বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার পর আবার খুলে নিয়ে যাওয়া হতো। সরকার এসব কিছু জানত। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিত না। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সত্যিকার বিকাশ করতে হলে একটি তথ্যবহুল সমীক্ষা প্রয়োজন। এরপর বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে সরকারি অর্থের অপচয় না হয়। তিনি মনে করেন, সৌরবিদ্যুতের নামে লুটপাটের আয়োজন বন্ধ করতে হবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বলেন, কারিগরি জ্ঞান না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এমন সমস্যা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন নতুন নীতিমালার আলোকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজটি যে ঠিকাদার করবেন, তিনিই সেটি দেখভাল করবেন এমনটি বলা আছে। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে যে ঠিকাদার ৩৩ কিলোওয়াটের সৌর প্যানেল বসিয়েছিল, তারা তো এখন আর ব্যবসাই করে না। এমন হলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে কোনো নীতিমালা না থাকার কারণে এমন হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে এমন হবে না।