পরীক্ষার খারাপ ফল হওয়ার অর্থ কখনও কখনও একজন শিক্ষার্থীর কাছে জীবনের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। বিশেষত শিক্ষাজীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীই হতাশ হয়ে পড়েন। পরিবার ও স্বজনদের প্রত্যাশার চাপ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এমন অনেক শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের প্রশ্নে বিমর্ষ করে ফেলতে পারে। যদিও পরীক্ষায় কৃতকার্যতা কিংবা অকৃতকার্যতা একজনের মেধা, সৃজনশীলতা কিংবা জীবনে সফল হওয়ার চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়।
এমন বাস্তবতায় এসএসসিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া ও অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে অকৃতকার্য বিষয়ে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ব্যবসায়িক ধারণা থাকলে প্রাথমিক অর্থায়নের সুযোগ রাখার ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত শিক্ষাধারায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সামনে বিকল্প পথ খুলে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব সুযোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কেন পিছিয়ে পড়ছে, তা চিহ্নিত করে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করাও জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
Manual2 Ad Code
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ‘চ্যালেঞ্জড স্টুডেন্টস কনভেনশন-২০২৬’ অনুষ্ঠানে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিক্ষামন্ত্রী ও সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান-সচিবদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব ব্যাপারে স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত এবার এসএসসিতে প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
Manual8 Ad Code
মাহদী আমিন বলেন, “এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভাগ্যের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই অর্থবহ হতে পারে না”।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার মানেই জীবনের ব্যর্থতা নয়। সার্টিফিকেটের ওপর ভিত্তি করে জীবন বিচার করা যায় না। একটি বিষয়ে খারাপ করার কারণে কারও মেধা ও সৃজনশীলতা নষ্ট হয় না”।
সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এবং সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তাদের মতে, বিকল্প শিক্ষাপথ শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জন ও কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ দিতে পারে। তবে উদ্যোগটির স্থায়ী সুফল পেতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কার, ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং প্রশিক্ষণের সঙ্গে কর্মসংস্থানের কার্যকর সংযোগ।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখি। যারা পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয় বা যথাযথ ফল করতে পারে না, তারা নানা ধরনের জটিলতার মধ্যে পড়ে। কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মতো বিকল্প পথ একজন মানুষকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে”।
তিন থেকে ছয় মাসে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ
Manual2 Ad Code
প্রচলিত ব্যবস্থায় এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পরবর্তী পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হতাশা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত মূল শিক্ষাধারায় ফেরাতে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
মাহদী আমিন বলেন, “ইতোমধ্যে শিক্ষক ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এক বছরের বদলে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে”।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “দশ বছর পড়াশোনা করার পর এত শিক্ষার্থী কেন ফেল করবে, সেটি আগে উদঘাটন করা দরকার”।
তার মতে, শিক্ষকের ঘাটতি, পাঠ্যক্রমের দুর্বলতা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু অকৃতকার্য হওয়ার পর বিকল্প ব্যবস্থা নিলে কিছু শিক্ষার্থী উপকৃত হবে, কিন্তু প্রতিবছর একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে না।
দক্ষতা অনুযায়ী খুলবে বিকল্প পথ
সব শিক্ষার্থীর আগ্রহ, মেধা ও কর্মদক্ষতা এক রকম নয়। কেউ প্রচলিত শিক্ষাধারায় এগিয়ে যেতে চায়, কেউ ব্যবহারিক কাজে বেশি পারদর্শী থাকে বা আগ্রহী হয়। এ পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বিকল্প দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার।
Manual4 Ad Code
মাহদী আমিন জানান, কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ এলাকার টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি জাপানি, কোরীয়, চীনা ও ইউরোপীয় ভাষায় তিন থেকে ছয় মাসের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাজের উপযোগী দক্ষতা গড়ে তোলা।
যেসব শিক্ষার্থীর ব্যবসায়িক বা উদ্ভাবনী ধারণা রয়েছে, তাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগ শুরু করতে প্রাথমিক তহবিল দেওয়ার কথাও ভাবছে সরকার। এতে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।