প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৪ঠা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

স্যাটেলাইটে আকাশের থাবা!

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০১:৪০ অপরাহ্ণ
স্যাটেলাইটে আকাশের থাবা!

Manual3 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

বাণিজ্যিক পরিকল্পনায় গোড়াতেই গলদ থাকায় বিপুল সম্ভাবনাময় বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট (বিএস-১)-এর সেবা বিক্রি থেকে মুনাফা করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বেক্সিমকো কমিউনিকেশনসের কমপ্লিট নেটওয়ার্ক সলিউশন ‘আকাশ’-এর থাবায় স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক আয় বন্ধ ছিল দীর্ঘ সময়। স্যাটেলাইটের এই উচ্চ প্রযুক্তির রাষ্ট্রীয় কোম্পানি সম্প্রতি অবচয় ব্যয় বাদেও সামান্য মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে বিএস-১ যাত্রা শুরু করলেও ছয় বছর শুধু লোকসানই দিয়েছে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

Manual7 Ad Code

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান স্যাটেলাইট সেবার সক্ষমতা ব্যবহার করে ‘ডাউনলিংক ফ্রিকোয়েন্সি’ ডিজাইন এবং বিক্রয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তাদের কারণে স্যাটেলাইটের কেইউ এবং সি ব্যান্ডে বিক্রয়যোগ্য সঠিক ফ্রিকোয়েন্সি নির্বাচন করা যায়নি। ফলে দেশের বাজার ছাড়াও তাইওয়ান থেকে শুরু করে ফিলিপাইন হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এবং পশ্চিম এশিয়ার কাজাখস্তান ও তাজিকিস্তান পর্যন্ত বিএস-১ এর সার্ভিস কাভারিং টেরিটরিতে সেবা বিক্রয়ের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০১৮ সালে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ নামে দেশের প্রথম কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক সুবিধাসংবলিত স্যাটেলাইট নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে। ওই বছরের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে প্রথম স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এই নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে কৃত্রিম উপগ্রহ ক্লাবে যুক্ত হয়। উদ্দেশ্য ছিল, এর মাধ্যমে দেশের দূরবর্তী অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ, টেলিযোগাযোগ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করা। একই সঙ্গে স্যাটেলাইটের পূর্ণ সক্ষমতা দেশে-বিদেশে বিক্রি করে আয় করা। স্যাটেলাইটটি তৈরি করে ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থালেস এলিনিয়া স্পেস। নির্মাণ ও উৎক্ষেপণে মোট ব্যয় হয় প্রায় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজদ জয় যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনালকে (এসপিআই) স্যাটেলাইট প্রকল্পে পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দেন। এসপিআই বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত স্যাটেলাইটের কেইউ এবং সি ব্যান্ড দুটোরই বাণিজ্যিক সেবা বিক্রয়ের জন্য ডাউনলিংক ফ্রিকোয়েন্সির অপ্রচলিত নকশা বা ডিজাইন করে দেয়। এসপিআইর নকশায় কেইউ ব্যান্ডে (এফএসএস সার্ভিস) ১০,৭০০-১০,৯৫০ মেগাহার্টজ ও ১১,২০০-১১৪৫০ মেগাহার্টজ এবং কেইউ ব্যান্ড (বিএসএস সার্ভিস) ১১,৭০০-১১৭৪০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারণ করে। অন্যদিকে, সি-ব্যান্ডে (এফএসএস সার্ভিস) ডাউনলিংক ফ্রিকোয়েন্সি নির্বাচন করা হয় ৪,৫০০-৪,৮০০ মেগাহার্টজ। এই দুটি ব্যান্ডেই বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট সেবা ডাউনলিংক বিশ্বব্যাপী (বিশেষ করে বিএস-১ কাভারেজ টেরিটরির দেশগুলোতে) প্রচলিত ফ্রিকোয়েন্সির চেয়ে কমপক্ষে ১০০০ মেগাহার্টজ অতিরিক্ত হয়ে পড়ে। ফলে, বাণিজ্যিক সেবায় ওই ফ্রিকোয়েন্সির ডাউনলিংক ডিভাইস পাওয়া দুষ্কর হয়। কারণ, সি-ব্যান্ডের ফ্রিকোয়েন্সি ডাউনলিংক ডিভাইস যেসব কোম্পানি তৈরি করে তা সাধারণত ৩,৪০০ মেগাহার্টজ ক্যাপাসিটির হয়ে থাকে। একইভাবে কেইউ ব্যান্ডেরও ফ্রিকোয়েন্সির ডাউনলিংক অতিরিক্ত ক্যাপাসিটির হওয়ায় ডিভাইস পাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটগুলোর সেবা ডাউনলিংক ক্যাপাসিটি সচরাচর প্রচলিত ডিভাইস-ফ্রেন্ডলি হয়ে থাকে। কোনো কোম্পানি বিশেষ কোনো দেশের জন্য কাস্টমাইজ ডিভাইস তৈরি করলে যে ব্যয় হয় তা সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা গ্রাহক কারও জন্যই বাণিজ্যিকভাবে সাশ্রয়ী হয় না। এ কারণে বিএস-১ চালুর পর থেকে মোট সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ আজোবধি অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসপিআই যখন স্যাটেলাইট সেবা ডাউনলিংক ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারণ করে তখন বিটিআরসির কেউ কেউ এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের একরোখা আচরণ ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভয়ে সে চেষ্টা ভেস্তে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে।

এদিকে, বিটিআরসি বিএসসিএলকে স্যাটেলাইটের দায়িত্ব হস্তান্তরের পর দেশের অভ্যন্তরে সেবা বিক্রয়ে তিনটি ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) অপারেটরকে বাণিজ্যিক দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশন, অপর দুটি যথাক্রমে বেঙ্গল গ্রুপের বেঙ্গল কমিউনিকেশনস্ ও বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস্। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনটি ডিটিএইচ অপারেটরের প্রত্যেককে পাঁচটি করে ট্রান্সপন্ডার বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অন্যদের বাদ দিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করে বেক্সিমকোর স্বত্বাধিকারী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত-বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন আকাশ। সে সময় বেক্সিমকো ‘আকাশ’ নামে একটি কমপ্লিট অ্যান্টিনা সলিউশন বাজারে আনে। সূত্রগুলো জানায়, সালমান এফ রহমান তখন প্রভাব খাটিয়ে বেঙ্গল গ্রুপকে ডিটিএইচ অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করতে দেয়নি। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনকেও এ কাজ থেকে কৌশলে দূরে রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, দেশীয় বাজারে চড়াদামে স্যাটেলাইট সেবা বিক্রি। বেক্সিমকো তখন প্রতি মেগাহার্টজ আড়াই হাজার ডলারে বিক্রি করে।

বিসিসিএল কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলেন, এত উচ্চ দামে প্রতি মেগাহার্টজ স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সেবা বিক্রির নজির তখন সারা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র বেক্সিমকোরই ছিল। উপায় না পেয়ে দেশের সরকারি-বেসরকারি সেবাগ্রহীতারা ওই দামেই উচ্চ প্রযুক্তির স্যাটেলাইট সেবা নিয়েছে। বিটিআরসির ল্যান্ডিং রাইটস নীতিমালা অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে কোনো সেবাগ্রহীতার বৈদেশিক কোনো স্যাটেলাইট সেবা ক্রয়ের সুযোগ নেই। এই ব্যবস্থা বেক্সিমকোকে দেশের বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করার সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু প্রাপ্য বাণিজ্যিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বিসিসিএল ও এই রাষ্ট্র। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, তিনটি ডিটিএইচ অপারেটর থাকলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হতো এবং দেশবাসী স্বল্পমূল্যে সেবা পেত। এখনো একচেটিয়া ব্যবসা করছে বেক্সিমকোর আকাশ।

Manual4 Ad Code

এদিকে, অডিট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বছরে অন্তত ৬৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে স্যাটেলাইট কোম্পানি বিসিসিএল। স্যাটেলাইটের অবচয় ব্যয় (ডেপ্রিসিয়েশন কস্ট) বেশি। প্রতি বছর প্রায় ১২০ কোটি টাকার বেশি অবচয় ব্যয় হয়ে থাকে। তারপরও গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে স্যাটেলাইট কোম্পানি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন ও অবচয় ব্যয় বাদে করপরবর্তী মুনাফা করেছে ৩৮ কোটি টাকা। এর আগের বছর মুনাফা হয়েছিল ২৯ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, পাঁচ আগস্টের পর বিটিভি তাদের ডিটিএইচ অপারেশনের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে খুব সীমিত আকারে কেইউ ব্যান্ড ব্যবহার ঠরে ডিজিটাল ট্রান্সমিশন চালায়। কিন্তু সেটা শুধুই পরীক্ষামূলক, বাণিজ্যিক অপারেশন নয়।

Manual4 Ad Code

সামগ্রিক বিষয়ে বিসিসিএলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এসব তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের বেশিরভাগ সক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। বর্তমানে বিসিসিএল নেতৃত্বে গতিশীলতা এসেছে। আমরা দেশের বাইরে বাজার ধরার চেষ্টা করছি। নেপালের সঙ্গে কথা হচ্ছে। এর আগেও নেপালে প্রতি ট্রান্সপন্ডার ১,৭০০ মার্কিন ডলার দরে মোট ছয়টি ট্রান্সপন্ডার বিক্রির আলোচনা এগিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ অজ্ঞাত কারণে ওই প্রক্রিয়া থামিয়ে দেন।’

Manual8 Ad Code

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদেশে আমাদের সেবা বিক্রি করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয় করতে হয়। এ বিষয়ে আমরা এখন মুক্তভাবে কাজ করতে পারছি। ডাউনলিংক ডিভাইসজনিত সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়েও বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আশা করি সফল হব। সেক্ষেত্রে বিসিসিএলের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যমান স্যাটেলাইট প্রতিস্থাপনের পুরো ব্যয় আমরা নিজেদের আয় থেকেই সম্পন্ন করতে পারব।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code