প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যুদণ্ড, বিচার হয় না কফিলের

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যুদণ্ড, বিচার হয় না কফিলের

Manual6 Ad Code

 

Manual7 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual5 Ad Code

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটি। এ বিষয়ে বাংলাদেশকে না জানিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে–দেশটিতে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের হাজারো অভিযোগ থাকলেও সৌদি নিয়োগকর্তাদের কেন বিচার ও শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এমন অভিযোগ যদি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে উঠত, তাহলে অন্তত মৃত্যুদণ্ড দিতে পারত না সৌদি সরকার।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে তলব করে বিষয়টি জানতে চেয়েছে ঢাকা। গতকাল রবিবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলাম সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। পরে দেশটির রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি নোট ভারবাল (কূটনৈতিক পত্র) হস্তান্তর করেন। এর আগেও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে সৌদি সরকারকে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের পাঠানো এক কূটনৈতিক চিঠিতে বলা হয়েছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি সরকার আগে থেকে কিছুই জানায়নি। সৌদি আরবের এক গণমাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পেরে বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি সরকারের কাছে চিঠি দেয়।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ওই দুই বাংলাদেশি হলেন নাজেরুল ইসলাম আব্দুল বশির এবং সিতি আক্তার (সুইটি)। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী, পবিত্র মসজিদের ভেতর অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অপরাধে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে এবং তদন্ত শেষে আদালতে সোপর্দ করে। আদালত অপরাধের গুরুত্ব এবং পবিত্র স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনা করে ইসলামি শরিয়াহ আইনের ‘তাআজির’ (বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তি) বিধানের আওতায় তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন, যা পরবর্তী সময়ে রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।

এ ব্যাপারে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মূনীর জানান, বিদেশে প্রবাসীদের সেবা দিতে দূতাবাসের কোনো গাফিলতি আছে কি না, সেটার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির বিচার নিশ্চয় এক দিনে হয়নি। পাশাপাশি সৌদি সরকার বিষয়টি কেন জানায়নি সেটাও জানতে চাওয়া দরকার। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠানোটাই খারাপ কাজ। অন্য কোনো দেশ এখন আর সৌদিতে গৃহকর্মী পাঠায় না। এই সেক্টরটিই নারীদের জন্য একটি নির্যাতনের ফাঁদ, এ বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে গেছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ নারী কর্মী। একই সময়ে দেশে এসেছে ৪১২ নারীর মরদেহ। এর মধ্যে ৮৪ অভিবাসী নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করা হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো–এসব ঘটনার ৭৬ শতাংশ ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। সৌদি আরবে যাওয়া বাংলাদেশি নারী কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত সময় চাপ দিয়ে কাজ করানো, পাসপোর্ট আটকে রাখা ও গৃহবন্দি করে রাখার কারণে শূন্য হাতে অনেকেই দেশে ফেরেন। তাদের কেউ কেউ ফেরেন কফিনবন্দি হয়ে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ জানান, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের প্রায় ৯৪ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন।

Manual3 Ad Code

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় অংশের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার নারী কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক বা শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে দেশে ফিরলেও আইনি জটিলতা এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির দুর্বলতার কারণে অপরাধী সৌদি কফিলদের জবাবদিহি বা শাস্তির মুখোমুখি করার নজির প্রায় নেই বললেই চলে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ৯৪ শতাংশ অভিবাসী নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ৯৭ শতাংশ। ৮০ শতাংশ নারী পর্যাপ্ত খাবার পাননি। ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। ১৫ শতাংশ নারীকে খাবার বা পানি ছাড়াই ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। ৯৭ শতাংশ নারীকে সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয়নি। এসব তথ্য শুধু ব্যক্তিগত নির্যাতনের ঘটনা নয়, বিদেশে নারী গৃহকর্মীদের কর্মপরিবেশ ও অধিকার সুরক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতার দিকটিও সামনে আনে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের জন্য কফিল বা নিয়োগকর্তার শাস্তি হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। নির্যাতনের কারণে কোনো কর্মী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতায় সৌদি পুলিশ কফিলকে গ্রেপ্তার করে সে দেশের শরিয়াহ আদালত বিচার করেছেন বা চূড়ান্ত শাস্তি দিয়েছেন এমন খুব একটা দেখা যায় না। তবে একটি বহুল আলোচিত ও ব্যতিক্রমী মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তির নজির রয়েছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিয়াদের একটি অপরাধ আদালত বাংলাদেশি গৃহকর্মী আবিরন বেগম আনসারকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে তার সৌদি নারী নিয়োগকর্তা আয়েশা আল-জাজানিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এই একই মামলায় ওই কফিলের স্বামী ও সন্তানকেও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো কফিলের এভাবে শাস্তি পাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। তবে প্রবাসী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কূটনৈতিক একটি সূত্রের মতে, বাংলাদেশি নারী কর্মীদের যৌন নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কোনো কফিলের বড় ধরনের শাস্তি পাওয়ার বা সেই মামলা সফলভাবে শেষ হওয়ার দৃষ্টান্ত প্রায় দেখাই যায় না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে–যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অনেক নারী কর্মী লোকলজ্জা বা সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আইনি অভিযোগ করতে চান না। কফিলের ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো চিকিৎসাগত বা ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। সৌদি আরবের প্রচলিত ‘কফালা’ প্রথার কারণে একজন কর্মী তার কফিলের অনুমতি ছাড়া চাকরি পরিবর্তন বা দেশ ত্যাগ করতে পারেন না। কোনো কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে থানায় বা বাংলাদেশের সেফ হোমে গেলে উল্টো কফিল তার বিরুদ্ধে পালিয়ে যাওয়ার বা চুরির মিথ্যা মামলা দেন, যার ফলে ভুক্তভোগী নারীকেই জেল খাটতে হয়। এ ছাড়া যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারীরা যখন দূতাবাসের সেফ হোমে আশ্রয় পান, তখন কফিলের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার চেয়ে যত দ্রুত সম্ভব সুস্থ শরীরে দেশে ফিরে আসাকেই একমাত্র লক্ষ্য মনে করেন। ফলে মামলা না হওয়ায় অপরাধী কফিলরা পার পেয়ে যান।

Manual6 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code