রাষ্ট্রযন্ত্রকে জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও গতিশীল করার কথা বলছে বর্তমান সরকার। দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনের কথাও বলা হচ্ছে বারবার। কিন্তু সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আট মাস পর প্রশাসনের শীর্ষ চিত্র নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
Manual3 Ad Code
গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তারা এখনও বহাল আছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও পদায়নে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অংশও ফিরতে পারেনি প্রত্যাশিত দায়িত্বে। প্রশাসনে বদলের বার্তা কার্যকরে ধীরগতি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রশ্ন উঠেছেÑ প্রশাসনে কাঠামোগত পরিবর্তন কি কেবল নীতিগত ঘোষণা ও বার্তায় সীমিত থাকবে, নাকি রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তরেও তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সরকারি আদেশগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, গ্রেড-১ ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ে বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতি হয়েছে। অর্থাৎ পরিবর্তন থেমে নেই। তবে সরকারের নীতি ও জন-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ব্যাপক পুনর্বিন্যাসের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তাতে ধীরগতি যেমন আছে, তেমনি পরিধি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা, পদোন্নতি ও পদায়নের ইতিহাস, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং বর্তমান দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে তথ্য যাচাই ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
Manual2 Ad Code
১৫ বছরের প্রভাব
Manual3 Ad Code
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনে ব্যাপক রদবদলের মধ্য দিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। বিএনপি সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে রাখার অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেনÑ এমন অভিযোগও ছিল দীর্ঘদিনের।
পরবর্তী প্রায় ১৫ বছরে সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব ছিলÑ এমন অভিযোগও এসেছে প্রকাশ্যে। প্রশাসনে ‘বঞ্চিত’ ও ‘সুবিধাভোগী’Ñ এমন দুই ধরনের পরিচয়ও পুরনো।
শুধু ‘বিএনপিপন্থী’ হলেই কি যোগ্য?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুতের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনে একাধিক দফায় রদবদল হয়। অনেক বঞ্চিত কর্মকর্তা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পান। তবে প্রশাসনের একটি অংশের অভিযোগ, প্রত্যাশা অনুযায়ী সবাইকে গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা পূর্ববর্তী অবস্থান বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই পুরনো প্রশ্নের সঙ্গে নতুন প্রশ্ন যুক্ত হয়েছেÑ আগের সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি কী?
Manual4 Ad Code
প্রশাসনের ভেতরে আরেকটি আলোচনা এখন জোরালোÑ আগের সরকারের সময়ে পদোন্নতি ও পদায়নে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হবে কি না। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপি ঘরানার হিসেবে পরিচিত কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যেতে পারেননি। কেউ কেউ যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বের বাইরে রয়েছেন।
তবে এখানেই প্রশাসন সংস্কারের বড় পরীক্ষাটি। কোনো কর্মকর্তাকে শুধু ‘বিএনপিপন্থী’ কিংবা ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ হিসেবে বিবেচনা করে পদায়ন করা হলে প্রশাসনের পুরনো সংস্কৃতিই নতুন নামে ফিরে আসবে।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক বলেন, প্রশাসন সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। শুধু আগের সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে কিংবা নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়।
তার মতে, অতীতে কোনো সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করাটাও একজন কর্মকর্তাকে অযোগ্য প্রমাণ করে না। তার অতীত ভূমিকা, সততা, দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও পেশাদারি বিবেচনায় নিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
‘গুপ্ত রাজনীতি’র বার্তা প্রশাসনেও?
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যে সরকারবিরোধী তৎপরতা, ষড়যন্ত্র ও ‘গুপ্ত’ কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতি সম্প্রতি (১ অক্টোবর) ফেনীর এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘গুপ্ত বাহিনী’ ও পালিয়ে যাওয়া শক্তির মধ্যে যোগাযোগের কথা বলেন।
সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি প্রশাসনের ভেতরেও কেউ সরকারবিরোধী তৎপরতা, অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে কি না, তা নজরে রাখছে সরকার।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মকর্তাদের অতীত পদায়ন, পদোন্নতি, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহের কথাও বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এখানেও ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন একাধিক জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, ‘গুপ্ত রাজনীতি’ খুঁজতে গিয়ে যদি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় অনুসন্ধানই প্রধান মানদণ্ড হয়ে যায়, তাহলে প্রশাসনের পেশাদার কাঠামো আরও দুর্বল হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ক্ষোভও রয়ে গেছে
সচিবালয়ে প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের বিভিন্ন পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়েও ক্ষোভ ছিল। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বৃহৎ একটি অংশ মনে করতেন, তাদের ন্যায্য মূল্যায়ন হয়নি। ওই সময় বিএনপি ঘরানা হিসেবে পরিচিত এমন কয়েকজন কর্মকর্তার নাম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পদয়নের প্রস্তাব উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নিÑ এমন দাবিও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেলেও তাদের পদায়ন নিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পদায়ন দেওয়া হয়নিÑ এমন অভিযোগও রয়েছে প্রশাসনে। পক্ষান্তরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়।
বড় প্রশ্ন অর্থ, জনপ্রশাসন ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রগুলোতে
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অর্থ, জনপ্রশাসন, মন্ত্রিপরিষদ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, পরিকল্পনা ও স্থানীয় সরকারÑ এসব জায়গায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা অন্যদের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরেনি। দীর্ঘ আট মাসেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিব নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যাপক সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব সরিয়ে আরেকটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করলে প্রশাসনের প্রকৃত সংস্কার হয় না। কর্মকর্তাকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, দক্ষতা ও সততার কারণে দায়িত্ব দিতে হবে। এই নীতিই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা।
সরকারের সামনে তাই দুটি কাজ একসঙ্গে করার চ্যালেঞ্জÑ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা, বর্তমান কর্মদক্ষতা ও সততা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা এবং ‘আমাদের লোক’ বনাম ‘ওদের লোক’Ñ এই রাজনৈতিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড তৈরি করা।