প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির মধ্যে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হচ্ছে না। উল্টো দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বব্যাপী এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন। যুদ্ধ-সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছেন কোটি কোটি মানুষ। কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানো ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতায় তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম ও আয় কমে যাওয়ার চাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। একই সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন নিম্নমধ্যবিত্তরাও।
Manual3 Ad Code
আজ ১৭ অক্টোবর বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। দারিদ্র্য দূরীকরণে সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈষম্য কমানো এবং সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, দারিদ্র্য মোকাবিলায় এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ার অন্যতম কারণ যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও সারের সরবরাহ এবং দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
Manual3 Ad Code
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এসব সংকটের প্রভাব পড়ছে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশের অর্থনীতিতে।
যুদ্ধের কারণে একদিকে ধ্বংস হচ্ছে অবকাঠামো, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন লাখো মানুষ। কর্মসংস্থান হারিয়ে বহু পরিবার নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে মানবিক সহায়তার ওপর। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়ে।
Manual7 Ad Code
বিশেষ করে যেসব দেশ খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমদানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের। আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় খাতেও খরচ কমাতে বাধ্য হয়।
দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ার আরেকটি বড় কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। খাদ্য, বাসস্থান, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের ব্যয় বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
মূল্যস্ফীতির কারণে শুধু দরিদ্র পরিবার নয়, নির্দিষ্ট বেতনে চলা মধ্যবিত্ত পরিবারও আর্থিক চাপে পড়ছে। মাস শেষে সঞ্চয় কমে যাওয়া, ধারদেনা বাড়া এবং ভবিষ্যৎ ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। হঠাৎ চাকরি হারানো কিংবা বড় ধরনের অসুস্থতা দেখা দিলে এসব পরিবারও দ্রুত দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া বিনিয়োগে স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। করোনা মহামারির পর অনেক বিশ্বের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও সব শ্রেণির মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান আগের অবস্থায় ফেরেনি। নতুন কর্মসংস্থান পর্যাপ্ত না হওয়ায় তরুণদের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য কমাতে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, স্থায়ী কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি যুদ্ধ ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানো না গেলে দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রগতি টেকসই হবে না।
বাংলাদেশেও বাড়ছে দারিদ্র্যের ঝুঁকি
বিশ্বের এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান, বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানের সংকটে নতুন করে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আতিকুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যম সারির কর্মকর্তা। তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় বেতন বাড়েনি। সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় সামলানো এবং ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কলাবাগানের বাসিন্দা মুসলেমা বলেন, সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তাতে ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এসে গেছে। তার মতে, শুধু সরকারকে দোষ দিলেই হবে না। বৈশ্বিক অবস্থায় সরকারের বা কী করার আছে। তারা চেষ্টা করছে সামাল দিতে।
Manual8 Ad Code
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) প্রফেসরিয়াল ফেলো ও অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য কমানোর জন্য যেসব কার্যক্রম প্রয়োজন, সেগুলোতে একধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এর ওপর যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দারিদ্র্য কমার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।