দল ও সরকারে শৃঙ্খলা ফেরাতে আপাতত সতর্কবার্তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাংগঠনিক-প্রশাসনিক পদক্ষেপের পথে হাঁটছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের এই অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও দলের দায়িত্বশীল নেতারা।
তাঁরা বলছেন, দল কিংবা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা—এই দুটি ঘটনা ‘কঠোর নীতি’র সেই অবস্থানকেই সামনে এনেছে। এর আগেও দুই মন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার গত ১৭ অক্টোবর আট মাস পূর্ণ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর নানা ব্যতিক্রমী সূচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দিনরাত একাকার রকেটের গতিতে ছুটে চলেছেন তিনি। সাদামাটা জীবনযাপন ও চলাফেরায় তিনি মানুষের মন জয় করে চলেছেন। সেখানে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে কেউ কেউ একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন।
তাঁদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে কোনো ঘটনায় জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন সরকারপ্রধান। মন্ত্রী ও এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তবু বিতর্ক থেমে নেই।
এসব কারণে সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে। ওদিকে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রী-এমপিসহ সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
Manual3 Ad Code
কেউ কেউ বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা—সরকারপ্রধানের এমন তৎপরতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সাধারণ মানুষ। প্রধানমন্ত্রী নগরীর বিভিন্ন সমস্যা সরেজমিনে গিয়ে দেখা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ জনমনে আশাবাদ তৈরি করছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘এখনই সব অনিয়ম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সবকিছুরই অস্তিত্ব আছে, থাকবে। তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সবকিছু একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
মীর শাহে আলম আরো বলেন, গত ১৭ বছর অনিয়ম করতে করতে অনেকের মধ্যে তা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে। সরকারের সহনশীল নীতির অর্থ দুর্নীতি বা অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। সবাইকে শৃঙ্খলার মধ্যে থাকতে হবে।
Manual7 Ad Code
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম আলোচনায় আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁদের কয়েকজনকে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন মিষ্টি।
পরে তারেক রহমানের নির্দেশনার পর ১ অক্টোবর স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। এরপর তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া মহানগর বিএনপি, যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটি, ছাত্রদল পশ্চিমের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
Manual6 Ad Code
রাড্ডাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আড়াই সপ্তাহের মাথায় নতুন বিতর্কে পড়েন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাঁর লোকজনকে ধাওয়া করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়। ইশরাক তাঁর পদক্ষেপের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এটি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। তবে ঘটনাটি জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা, আইন প্রয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
গত রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ওই রাতেই ইশরাক এ খবরকে গুজব বলে দাবি করেন। পরের দিন তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। সেই অনুযায়ী, গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, কেউ যদি মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থী কোনো কাজ করেন, সেটা তাঁর যত কাছের মানুষই হোন না কেন, সে বিষয়ে তিনি যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, সেটাই নেবেন। তিনি এরই মধ্যে সেটা প্রমাণ করেছেন। আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই। সুতরাং এটা আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে।’
প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের আগে আট মাস বয়সী বিএনপি সরকারের আরো দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। তাঁরা হলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এবং তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এদিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে তা গৃহীত হয়। এ ছাড়া গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন জহির উদ্দিন স্বপন। যদিও তাঁকে ওই দিনই মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগের দিন তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আন্দালিভ রহমান পার্থ। জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রিত্ব থেকে এক প্রকার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আলোচনা আছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন কারণে তাঁরা পদত্যাগ করেছেন। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেউ পদত্যাগ করেছেন আবার নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন। মিষ্টির পদত্যাগ ঠিক আছে। কিন্তু ইশরাক মনে হয় সরকারকে বিব্রত করতে চাননি, এই জন্য তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু তিনি তো মাদকবিরোধী অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি।’
তিনি বলেন, ‘সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড সুবিধা বাস্তবায়নসহ বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে এখনো জনমনে স্বস্তি ফিরে আসেনি। কর্মসংস্থান নিয়ে এখনো প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কিন্তু এটা ঠিক যে সরকারকে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখ পড়তে হয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা আছে মানুষের জন্য ভালো কিছু করার। সরকারের কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক অনেক বার্তা আছে। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে সরকারকে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে।’