অবশেষে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নামের ভোটযন্ত্রটির বোঝা নামাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কারণ নির্বাচনে যন্ত্রটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সংস্থাটি সরে এলেও নানা জটিলতায় এটি ধ্বংস করার উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না। তার ওপর গুনতে হচ্ছিল গুদাম ভাড়ার কোটি কোটি টাকা।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি কমিশন বৈঠকে ভোটযন্ত্রটি ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ জন্য কমিটি গঠন করে দিয়েছে সংস্থাটি। মামলা সংক্রান্ত বিষয় বা আইনি জটিলতা আছে, এমন নির্বাচনে ব্যবহৃত মেশিনগুলো রেখে বাকিগুলো ধ্বংস করার জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে ইসির কাছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। ১ হাজার ৫৯৯টির মতো মেশিন খোয়া গেছে।
অন্যগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) কাছে রাখা মেশিনগুলোর জন্য ওয়্যারহাউজের ভাড়া ৭০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন গোডাউনে রাখা মেশিনগুলোর জন্য গুনতে হচ্ছে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
বর্তমানে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে ৮৬ হাজার ২৩৩টি, সিলেট অঞ্চলে ২ হাজার ৬০৭টি, রাজশাহী অঞ্চলে ১৩ হাজার ৫৩০টি, রংপুর অঞ্চলে ৪ হাজার ৪০৫টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৬ হাজার ৪২৮টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ হাজার ১৩৫টি, খুলনা অঞ্চলে ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ হাজার ৮৭৫টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৮৫টি, বরিশাল অঞ্চলে ৫ হাজার ৮৭টি এবং ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি ইভিএম রয়েছে।
এছাড়া নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট এবং দুটি উপজেলা নির্বাচন অফিসে আগুনে ১৫৭টি ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ইসির কাছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে।
ইভিএম যেভাবে আসে
বাংলাদেশে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ওই বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে বুয়েটের তৈরি ইভিএম প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়। এরপর সীমিত পরিসরে বিভিন্ন নির্বাচনে এ যন্ত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ইভিএমে সমস্যা দেখা দেওয়ায় পরবর্তী সময়ে সেটি আর ব্যবহার করা হয়নি। পরে কে এম নূরুল হুদা কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ জোরদার হয়। কমিশনের জন্য বিএমটিএফ ইভিএম তৈরি করে। ২০১৭ সালে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডের ছয়টি কক্ষে পরীক্ষামূলকভাবে এসব ইভিএম ব্যবহার করা হয়।
এরপর দেড় লাখ ইভিএম কেনার জন্য ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। পরে ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেড় লাখ ইভিএম কেনা হলেও ওই নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল।
Manual5 Ad Code
পরবর্তী সময়ে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা করে। এ জন্য ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নিতে চাইলেও আর্থিক সংকটের কারণে সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি। এরপর পুরোনো ইভিএমের কার্যকারিতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৪০ হাজার যন্ত্র ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ইভিএম মেরামতের জন্য ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানায় বিএমটিএফ। সরকার এ অর্থ দিতেও অপারগতা প্রকাশ করায় শেষ পর্যন্ত ব্যালট পেপারেই ভোট গ্রহণ করা হয়।
ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বাদ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে আয়োজন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই কমিশন ভোটের আগে দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসে। পরবর্তীতে তারা সংসদ নির্বাচন আইন ও বিধিমালা থেকেও এ সংক্রান্ত বিধান তুলে দেয়। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধিমালা থেকেও মেশিনটির ব্যবহারের বিধান তুলে দেয়া হয়। ফলে সকল নির্বাচনেই এই ভোটযন্ত্র ব্যবহারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় মেশিনটি ব্যবহার অযোগ্য করার পর এখন ধ্বংস করে দেওয়ার প্রক্রিয়া হাতে নিচ্ছে ইসি।
Manual4 Ad Code
তদন্তের আলামত রেখে নিষ্পত্তি করতে চায় কমিশন
ইভিএমের ভবিষ্যৎ ব্যবহার সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা হবে না। তবে ইভিএম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন একটি বিষয়ে তদন্ত করছে। অডিট বিভাগ থেকেও একটি নিরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের তিনটি নির্বাচন নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই এখন ধংস করা হবে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্প্রতি ইভিএম নষ্ট করে ফেলার বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। চিঠিতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারসংক্রান্ত কোনো মামলা রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। মামলা থাকলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের নাম, নির্বাচনী এলাকা, নির্বাচনের তারিখ, মামলার বিবরণ, সংশ্লিষ্ট ইভিএমের সংখ্যা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্যান্য তথ্য দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইভিএম সংরক্ষণের জন্য গুদাম বা জায়গা ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে কোনো মামলা থাকলে তার তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইভিএম রাখার জন্য ভাড়া করা গুদামের বকেয়া থাকলে সেই হিসাবও জানাতে বলা হয়েছে।
Manual6 Ad Code
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, কমিশনের একেবারে শুরুর দিকের সভাতেই ইভিএম আর ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যন্ত্রগুলো এখনো কমিশনের কাছে রয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে কমিশনকে নানা ধরনের জটিলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, ইভিএম নিয়ে গঠিত বিভিন্ন কমিটির বক্তব্য শুনেছে কমিশন। এরপর চূড়ান্ত নিষ্পত্তিসহ আগের কমিটির সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিশন চায়, যত দ্রুত সম্ভব ইভিএমগুলো নিষ্পত্তি করা হোক। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যেসব আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে দেওয়া হবে। এরপর অবশিষ্ট ইভিএমগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।