আট মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, এখনও নিখোঁজ প্রায় দুই হাজার
আট মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, এখনও নিখোঁজ প্রায় দুই হাজার
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০৭:১৩ পূর্বাহ্ণ
Manual7 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
দেশে শিশু হত্যা ও নিখোঁজ সংক্রান্ত অপরাধমূলক ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজের পর ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বছরজুড়ে নিখোঁজ হওয়ার পর অনেক শিশুর মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় কিংবা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ জন নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে আসক জানায়, একই সময়ে শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় মোট ১৫৫ জন শিশু নিহত হয়েছে। র মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে নিহত ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত ৪৯, ধর্ষণের পর হত্যা (দুই ছেলেশিশুসহ) ২৬, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪, গুলিতে নিহত ৩, গৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু ২, উত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা ২ এবং অপহরণের পর হত্যা করা হয় ১ জনকে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনা আছে।
শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক স্বজনদের সঙ্গেও শিশুদের নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হতে দেখা গেছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে সাত শিশু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিন বোনের মধ্যে সিপার বয়স ১০ এবং ইকরার ১৭ বছর ও সাইমা আক্তারের বয়স ছিল ২১ বছর।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে খুন করা হয় ১২ বছরের ছেলে আয়ুশকে। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর লাশ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তাঁর এক বছরের সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছরের তিন শিশুকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে মোট ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা মাসে গড়ে প্রায় ২৯৫টি।
শিশু নিখোঁজের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশীয় গণমাধ্যমে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের খবর প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, প্রথম সাত মাসে দেশে মোট ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশু নিখোঁজ হলেও তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন অর্থাৎ ৮৭ শতাংশের বেশি শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ২ হাজার ৩৮ জন শিশু নিখোঁজ রয়েছে, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।
Manual8 Ad Code
বাংলাদেশে শিশুদের ওপর ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে গত ২২ মে একটি বিবৃতি দেয় জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স অপরাধীদের দায়মুক্তি বন্ধ করার পাশাপাশি ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজজুড়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। একইসঙ্গে শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া, মানসিক সহায়তা এবং সুরক্ষা সেবার ঘাটতি দূর করার আহ্বান জানানো হয়।
অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় শোক, ক্ষোভ ও হতাশায় ভাসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না অপ্রতিমের হত্যার ঘটনার একটা ফটোকার্ড শেয়ার করে লিখেছেন, ‘কাকে দায়ী করবেন?’
Manual7 Ad Code
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল ফেলো, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের টনক ঠিক কখন নড়বে? আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তানকে মেরে ফেলা হয়েছে। কয়েক দিন আগে রংপুরের এক শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। একের পর এক ঘটনা ঘটছে, অথচ সরকারের দিক থেকে পরিস্থিতির গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতের তৎপরতা কোথায়? পুলিশের কাজের চেয়ে নাটকই যেন বেশি চোখে পড়ছে। চার খুনের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সামনে কান্না কাঁটি করে যেভাবে কথা বললেন, সেখানে তদন্তের অগ্রগতির চেয়ে ক্যামেরার সামনে নাটকীয়তাই বেশি দৃশ্যমান ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, আর কতগুলো খুন, আর কতগুলো বিস্ফোরণ, আর কতগুলো পরিবার আক্রান্ত হলে সরকারের টনক নড়বে?’
প্রকাশক সুফি সুফিয়ান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মেসে মিল না দিয়ে ভাত খাওয়ার অপরাধে মানুষ মানুষকে মেরে ফেলে। একটা আই ফোনের জন্য বাচ্চা ছেলেকে খুন করে ফেলে মানুষ। বউয়ের সাথে দ্বন্দ্ব লেগে তিন সন্তানকে ড্রিংকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে ফেলে মানুষ। নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্য বাচ্চা মেয়েকে খুন করে টুকরো টুকরো করে ঘরের ভেতর ফেলে রাখে মানুষ। সারাদিন এইসব খুনখারাবির খবর দেখে ঘুমকে হত্যা করে জেগে আছি।’
সাংবাদিক একুশ তাপাদার ফেসবুকে লিখেন, ‘সবচেয়ে বেশি নির্মমতার শিকার আমাদের শিশুরা। আক্রান্ত আমাদের আগামী।’
Manual8 Ad Code
কবি আবিদ ফায়সাল ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অপ্রতিম নেই! হাজার হাজার অপ্রতিমের গুম এবং খুনের সংবাদে রাষ্ট্র নীরব কেন? এর রহস্য কী?’
কবি ও প্রাবন্ধিক আলমগীর শাহরিয়ার লিখেছেন, ‘সম্প্রতি সংসদে রুমিন ফারহানা বলেছেন, দেশে ৭ মাসে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছেলে অপ্রতিম তাদেরই একজন। অপ্রতিম আজ চির-নিখোঁজের দলে। দেশটা যেন মৃত্যুপুরী হয়ে গেছে।’
Manual3 Ad Code
অভিনেত্রী শাহনাজ খুশী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি বাঁচব কেমনে; আমার জীবন যাবে কেমনে—অপ্রতিমের মায়ের এই আহাজারি কত শত রাত ঘুমাতে দেবে না কোনো মা-বাবাকে।’
সাংবাদিক পুলক ঘটক ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, ‘অপরাধীদের দায়মুক্তি দিলে দেশ অনিরাপদ হয়। আসল অপরাধীকে বাঁচাতে নিরপরাধ জজ মিয়ারা বলীর পাঁঠা হলে সব অপরাধ প্রশ্রয় পায়। মিথ্যা মামলা দায়ের ও ফেক বিচার আয়োজন সরকারের রাজনীতি হলে দেশ অরাজক হয়। কারও সন্তান এভাবে না মরুক। সুবিচার চাই; আইনের শাসন চাই।’