গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বাড়তি চাপ এবং ধারাবাহিকভাবে কমছে দেশীয় গ্যাসের মজুদও। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবারও কয়লার দিকে ঝুঁকছে সরকার।
নতুন করে দুই হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী এবং পটুয়াখালীর পায়রায় এই দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হতে পারে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এর মধ্যে মাতারবাড়ীতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
Manual1 Ad Code
বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা সাম্প্রতিক সময়ে আরো প্রকট হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির সংকট তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি ব্যয়ে স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে সরকারকে। এতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে ভর্তুকির চাপও বাড়ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে পরিবেশগত উদ্বেগ থাকলেও আরো দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মাতারবাড়ী সম্প্রসারণ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার। তাঁরা আরো বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে সংকট এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘এলএনজির তুলনায় কয়লার উৎস ও সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
Manual3 Ad Code
গত কয়েক দশকে যুদ্ধের সময় ছাড়া কয়লার সরবরাহ বন্ধ হওয়া বা দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা খুব বেশি দেখা যায়নি। কয়লার দামও মোটামুটি স্থিতিশীল এবং সরবরাহে ঘাটতির সম্ভাবনাও তুলনামূলক কম।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কয়লা আমদানির ব্যবস্থা করা গেলে ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দিতে পারে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।’
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘দেশে আরো দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্রিড-সংযুক্ত নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের মাতারবাড়ী সম্প্রসারণ প্রকল্পের ডিপিপি এরই মধ্যে তৈরি করেছে বিসিপিসিএল। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার। মাতারবাড়ীতে আগে থেকেই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অবকাঠামো থাকায় নতুন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য স্থানটি বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট তিন বছরের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ইউনিট প্রায় চার বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসতে পারে। বিদেশি অর্থায়ন না পাওয়া গেলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পায়রায়ও আরো এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের দ্বিতীয় পর্যায়ের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।’
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ছয় হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট। নতুন দুই হাজার ৬৪০ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে এই সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৯ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াটে দাঁড়াবে। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনায় বছরে প্রায় দুই কোটি টন কয়লা প্রয়োজন হয়। এর বড় অংশ আমদানি করা হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে। নতুন দুটি কেন্দ্র চালু হলে কয়লার চাহিদা আরো উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে আমদানিনির্ভর কয়লার পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
Manual1 Ad Code
দেশীয় কয়লা উত্তোলনে জোর : উচ্চমূল্যের কারণে এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানিতে চাপ বাড়ার পাশাপাশি দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ কমে আসায় জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় লোকজনের সম্মতি পাওয়া গেলে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক, বসতি ও পরিবেশগত বিষয়গুলো সমাধান করেই সেখানে উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এদিকে বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে প্রায় ৩০০ একর এলাকায় কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় লোকজনের মোটামুটি সম্মতি রয়েছে। সেখানে বোরহোল করার প্রস্তুতি চলছে। বিদেশি একটি কম্পানি এ কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ এবং রংপুরের খালাশপীরেও কয়লার মজুদ রয়েছে। তবে সামাজিক ও অন্যান্য কারণে এসব এলাকায় এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা সামাজিক বিষয় ও জমি অধিগ্রহণ। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সামাজিক সচেতনতা তৈরির কাজ চলছে।
দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশীয় কয়লা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবেশ, কৃষি, বসতি ও পুনর্বাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।’
কয়লার সঙ্গে সৌরবিদ্যুতেও জোর : কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে।
বিপিডিবির তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) গতকাল শনিবার পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মোট সক্ষমতা ১৮৫২.০৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ১৪৭৩.০৫ মেগাওয়াট এবং গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয় (অফ গ্রিড) এমন বিদ্যুতের সক্ষমতা ৩৭৮.৫৬ মেগাওয়াট।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। একই সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে নতুন এফএসআরইউ আনা হচ্ছে এবং দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতাও রয়েছে। অন্যদিকে নতুন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত বা অব্যবহৃত সক্ষমতা তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। এটি বড় একটি চ্যালেঞ্জ।’
শফিকুল আলম বলেন, ‘জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশে এখনো অনেক সুযোগ রয়েছে। সেগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন ধরনের কৌশল নেওয়া সম্ভব।’
দেশীয় কয়লা উত্তোলন প্রসঙ্গে আইইইএফএর প্রধান বিশ্লেষক বলেন, ‘ওপেন-পিট মাইনিং করা হলে পুনর্বাসন ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। এসব ব্যয় যুক্ত হলে দেশে কয়লা উৎপাদনের খরচ অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি হতে পারে।’