অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার আগের দিন ১৬ ফেব্রুয়ারি ছয়টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। দায়িত্ব পালনের দেড় বছরে এগুলোসহ মোট ১৩২টি অধ্যাদেশ জারি করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। এগুলোর মধ্যে সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কিছু অধ্যাদেশও রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির জারি করা এসব অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে আইনে রূপান্তর করতে হবে। না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াসহ সব কাজের সঙ্গে বিএনপি পূর্ণ একমত ছিল না। ফলে সব অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর হবে কি না, এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনজীবীরা বলছেন, রাষ্ট্রের গুণগত সংস্কার ও জনস্বার্থমূলক অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করা উচিত।
তবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার কোন কোন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করবে, এখনকার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হয়তো সেই সিদ্ধান্ত নেবে। এ ক্ষেত্রে নিজেদের সংস্কারনীতি ও নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোকে সরকার এড়িয়ে যাবে এটিই স্বাভাবিক।
আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ওই বছরে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগে পর্যন্ত ৩৫টি অধ্যাদেশ জারি করে। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, ফৌজদারি অপরাধ, দুর্নীতি দমন, অর্থ পাচার, জনপ্রশাসন ও শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার, অর্থনীতি, রাজস্ব, কর ও বাজেট, ব্যাংকিং, আর্থিক খাত ও নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও সুশাসন বিষয়ে এসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালনের ৫৫৯ দিনে মোট ১৩২টি অধ্যাদেশ জারি করে। এসব অধ্যাদেশকে সংবিধান অনুযায়ী আইনে পরিণত করতে হলে বর্তমান সরকারকে দিনে গড়ে সাড়ে চারটি করে অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করতে হবে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সূত্রমতে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতে পারে। সেদিন শুরু হলে আগামী ২৮ মার্চের মধ্যে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তর করতে হবে। এর মধ্যে যেগুলো আইনে পরিণত হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা অকার্যকর হয়ে যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ কী–এ প্রশ্নে সাবেক একজন মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রেক্ষাপটে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছিল, দেশে এখন সেই প্রেক্ষাপটের অস্তিত্ব কতটুকু রয়েছে অবশ্যই তা বিবেচনা করতে হবে। বিএনপির জোট ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারকে আগে থিতু হতে হবে। এরপর তারা করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার ১৮০ দিনের যে কর্মসূচির কথা বলছে, এর মধ্যেও বিষয়টি থাকবে। কারণ, ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে কোনটি আগে, কোনটি পরে করা হবে, তাও নিশ্চয়ই তাঁরা নির্ধারণ করবেন।
Manual7 Ad Code
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করার আগে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওই অধ্যাদেশের আসলে দরকার আছে কি না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মন্ত্রীকে প্রথম সেই সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। কোনো অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের প্রয়োজন হলে তার খসড়া মন্ত্রিসভায় ওঠাতে হবে। মন্ত্রিসভায় আলোচনার পর খসড়া পাস হলে আইনে রূপান্তরের জন্য তা সংসদে যায়।
Manual5 Ad Code
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর সংসদের প্রথম বৈঠকে এসব অধ্যাদেশ উপস্থাপন করতে হবে। কোনো অধ্যাদেশ এর আগে বাতিল না হলে তা অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ৩০ দিন অতিবাহিত হলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে তা অননুমোদন করে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হলে অধ্যাদেশটির কার্যকরতা লোপ পাবে।
সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশ যথা শিগগির সংসদে উপস্থাপিত হবে এবং সংসদ পুনর্গঠিত হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদের বিধান প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হবে। ৮৭, ৮৮ ও ৮৯ অনুচ্ছেদে যথাক্রমে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি, বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং নির্দিষ্টকরণ আইন নিয়ে বিস্তারিত বলা আছে। এগুলোর বেশির ভাগই বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাধারণত এসব অধ্যাদেশ হুবহু সংসদে আইনে পরিণত করা হয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার কোন অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করবে তা তাদের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। যেগুলো জনস্বার্থমূলক ও আইনশৃঙ্খলার সহায়ক, সেগুলো রাখা উচিত। তবে হুবহু না রেখে পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন করবে তারা। কারণ, বিএনপির নিজেদের সংস্কারনীতি আছে। নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে কোনো অধ্যাদেশ সাংঘর্ষিক থাকলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সেগুলো আইনে পরিণত করবে না।
Manual4 Ad Code
এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন আনতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে গঠিত নবম সংসদে ১২২টি অধ্যাদেশকেই একসঙ্গে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়। এরপর অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করে। পরে সেগুলোকে প্রক্রিয়া অনুযায়ী আইনে রূপান্তর করা হয়। অন্য অধ্যাদেশগুলো সংসদ অনুমোদন না দেওয়ায় সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই দেশের শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্য করা হয়েছে। কাজেই বর্তমান সরকারের উচিত হবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এগুলোকে আইনে পরিণত করা। বর্তমান সরকার কিছু অধ্যাদেশ আইনে পরিণত না করলে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হবে।