প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

অবৈধ সম্পদের ‘রাজা’ হারুন

editor
প্রকাশিত জুন ১৭, ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ণ
অবৈধ সম্পদের ‘রাজা’ হারুন

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

অঘটন-ঘটনপটীয়সী পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা ডিবি হারুনের কেলেঙ্কারির অন্ত নেই। ‘ভাতের হোটেল’ চালুসহ অনেক নাটকীয় ঘটনা ও বিতর্কের জন্ম দেওয়া ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও শেষ নেই।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, জমি দখল, নির্যাতন, গুম-অপহরণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, এমনকি নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে বহুল আলোচিত ডিবি হারুন দেশের অন্যতম বিতর্কিত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা।

১৮৫টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার এই আসামি দুদকের সম্পদ জব্দের একের পর এক পদক্ষেপের পরও এখনো অধরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তিনি পলাতক। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বর্তমানে তিনি স্ত্রীসহ হয় আমেরিকায় অথবা লন্ডনে পালিয়ে আছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিস্ময়কর এক দুর্নীতিবাজ ও নির্মমতার প্রতীক হলেন ডিবি হারুন।

Manual5 Ad Code

হারুনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে নেমে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নতুন নতুন তথ্য উদঘাটন করছে। করছে। রাজধানীর বাড্ডা ও কক্সবাজারে তার মালিকানাধীন জমি ও প্লটের সন্ধান পেয়ে সেসব সম্পদ বাজেয়াপ্তের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
সম্পদ বাজেয়াপ্তে দুদক থেকে আবেদন করা হলে আদালত তা ক্রোকের আদেশ দেন।

দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, হারুন রাজধানীর বনানী, উত্তরাসহ বেশ কটি অভিজাত ক্লাবের সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, এসব সদস্য পদ পেতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। দুদকের তদন্তকারী দল আরো প্রমাণ পেয়েছে, হারুন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সদস্য পদ পেতেও প্রভাব খাটিয়েছেন। বর্তমানে দুদক হারুনের বিরুদ্ধে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি মামলার তদন্ত করছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, হারুনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর, বিক্রি বা গোপন করা রোধে কমিশন সেগুলো জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করতে আদালতের আদেশ চাইলে আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করেন। এ অভিযোগে তাঁর স্ত্রী শিরিন আক্তার এবং ছোট ভাই এ বি এম শাহরিয়ারকেও আসামি করা হয়েছে। হারুনের স্ত্রী শিরিন আক্তারের বিরুদ্ধে ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার এবং ভাই শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

১০০ বিঘা জমি, পাঁচ ভবন ও দুই ফ্ল্যাট জব্দ

দুদকের আবেদনের পর ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত হারুনের প্রায় ১০০ বিঘা জমি, পাঁচটি ভবন ও দুটি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তাঁর নামে থাকা ১০টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে জমা আছে প্রায় এক কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন এই আদেশ দেন।

আত্মীয়-স্বজনের সম্পদেও দুদকের নজর

Manual8 Ad Code

হারুন শুধু একা নন, তাঁর শ্বশুর মোহাম্মদ সোলায়মান, ঘনিষ্ঠজন জাহাঙ্গীর হোসেন এবং ছোট ভাই এ বি এম শাহরিয়ারের অবৈধ সম্পদেও দুদক নজর রাখছে। গত ১৫ মে আদালত হারুনের শ্বশুরের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এর মধ্যে দুটি হিসাবে প্রায় ৬০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। হারুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাহাঙ্গীর হোসেনের নামে উত্তরার ৮.৬০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ১০ তলা ভবন ক্রোক করা হয়েছে। অন্যদিকে ভাই শাহরিয়ারের দুটি ব্যাংক হিসাবও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

দুদকের দাবি, এসব সম্পদ প্রকৃতপক্ষে হারুনের বেনামি সম্পদ। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

আরো ফ্ল্যাট-প্লট জব্দ

Manual2 Ad Code

রাজধানীর উত্তরায় হারুনের নামে থাকা আরো তিনটি প্লট এবং এক হাজার ৫৭০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট জব্দ করেছে দুদক। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনুসন্ধান যত এগোচ্ছে, তত বেরিয়ে আসছে হারুনের বিপুল সম্পদ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর রোডের আটতলা ভবনে সপরিবারে থাকতেন হারুন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১০ কাঠার ওপর নির্মিত ভবনটির নেমপ্লেট খুলে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ি, ২০ নম্বর রোডে প্রাইম লেক ভিউ ভবনে জিআর মিট ও গ্রিট নামে ট্রাভেল এজেন্সি ও হোটেল, ৫ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর রোডে ১০ কাঠার দুটি প্লট, ১০ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে পাঁচ কাঠার প্লট এবং ১২ নম্বর রোডের ৪ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলায় অফিস, সোনারগাঁও জনপথ রোডে ছয়তলা বাড়ি রয়েছে হারুনের।

উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের উত্তরা স্মৃতি কেবল টিভি লিমিটেডের পাশে একটি পাঁচ কাঠার প্লট, উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডে ইন্ডোরা নামের পাঁচতলা বাড়ি, শাহ মখদুম এভিনিউয়ে ১২ নম্বর প্লট ও সোনারগাঁও জনপথ রোডের ৭৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের জমির মালিকানা হারুনের নামে। পাশাপাশি জমজম টাওয়ারের পাশে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে ৪০টি ফ্ল্যাট, ১৪ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর রোডের ১৭ ও ১৯ নম্বর প্লটও হারুনের। এ ছাড়া নয়াপল্টনে মানি এক্সচেঞ্জ দোকান, গাজীপুরের সবুজপাতা রিসোর্ট, নিকুঞ্জের ৩ নম্বর রোডে রিক্রুটিং ও ট্রাভেল এজেন্সি, টঙ্গীর ২৭ মৌজায় আট বিঘা জমি, ছায়াকুঞ্জ আবাসিক প্রকল্পের ভেতর ১২ বিঘা জমি রয়েছে। সম্পদের তালিকায় আরো রয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে ৩৩ শতক জমি। মালিকানায় আছেন হারুন, তাঁর স্ত্রী শিরিন আক্তার ও ভাই এ বি এম শাহরিয়ার।

সূত্র আরো জানায়, সাভারের নন্দন পার্কেও হারুনের মালিকানা আছে। বনানী কবরস্থানের দক্ষিণ পাশে ২০ কাঠার প্লট দখল করে একটি কম্পানির কাছে ৭০ কোটি টাকায় বিক্রি করেছেন হারুন। দুবাইয়ে রয়েছে তাঁর সোনার দোকান। এ ছাড়া হারুনের স্ত্রী শিরিন আক্তারের নামে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া এক হাজার ৫৩২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এফবিআই আটক করেছে বলে জানিয়েছে দুদক। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের নিউ হাইড পার্ক এলাকায় স্ত্রীর নামে পাঁচ মিলিয়ন ডলারে বাড়িও কিনেছেন হারুন।

আরো জানা গেছে, হারুন তাঁর চাকরিজীবনের ২৬ বছরে বেতন পেয়েছেন দুই কোটি ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে তিনি শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্থানীয় জনগণ ও পুলিশ বাহিনীর একাংশের প্রশ্ন, মিঠামইনের প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট থেকে নিউইয়র্কের বাড়ি—ডিবি হারুনের সম্পদের শেষ কোথায়?

শতকোটি টাকার বিলাস সাম্রাজ্য ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হোসেনপুর গ্রামে প্রায় ৪০ একর জমির ওপর হারুন গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’। হেলিপ্যাড, আধুনিক সুইমিংপুল, প্রিমিয়াম স্যুট, বিলাসবহুল কটেজসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এই রিসোর্টে। রিসোর্টটির প্রিমিয়াম স্যুটের ভাড়া প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা এবং ডিলাক্স রুমের ভাড়া ১০ হাজার টাকা। রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ছোট ভাই ডা. শাহরিয়ার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রিসোর্ট নির্মাণে ব্যবহৃত বেশির ভাগ জমি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দখল করা হয়েছে। অনেক জমির মালিক প্রকৃত মূল্য পাননি। কেউ ২০ লাখ টাকার জমির বিপরীতে মাত্র দুই লাখ টাকা, আবার কেউ ১০ লাখ টাকার জমির বিপরীতে মাত্র এক লাখ টাকা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও বিত্তশালীদের আনন্দ-ফুর্তির জন্য অত্যন্ত নিরাপদ স্থান হয়ে উঠেছিল হারুনের এই রিসোর্ট। এখানে রাজধানীর মিডিয়াপাড়ার মডেলরা অবাধে যাওয়া-আসা করতেন। মিঠামইনের বাসিন্দা দিলীপ কুমার বণিক অভিযোগ করেন, তাঁর এক একর ১০ শতাংশ জমি রিসোর্টের জন্য নেওয়া হলেও তিনি পেয়েছেন মাত্র ৫০ হাজার টাকা, যেখানে জমিটির বাজারমূল্য অন্তত ২০ লাখ টাকা।

ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে ডিবি প্রধান

হারুন অর রশীদের জন্ম কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ছাত্রজীবনে ১৯৯৮ সালে ছাত্রলীগের বাহাদুর-অজয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। ২০০০ সালে ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেন। হারুন শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে একসময় চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেলেও তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া নারীঘটিত ইস্যুতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন হারুন। শোবিজের এক শ্রেণির নায়িকার সঙ্গে হারুনের ছিল সখ্য।

যেভাবে আলোচনায় আসেন হারুন

২০১১ সালে জাতীয় সংসদের সামনে তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় প্রথম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসেন হারুন। সে সময় তিনি ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ছিলেন। জয়নুল আবদিন ফারুককে ধাওয়া করা, তাঁর জামা খুলে নেওয়ার ছবি ও ভিডিও দেশজুড়ে ভাইরাল হয়। এর পর থেকে পুলিশ বিভাগে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন হারুন।

আলোচনায় ‘হারুনের ভাতের হোটেল’

২০২২ সালের ১৩ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান হারুন। দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিবি কার্যালয় নতুন পরিচিতি পায় ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ নামে। অভিযোগ নিয়ে আসা হাই প্রোফাইলের ব্যক্তি ও শোবিজের নায়ক-নায়িকাদের নিজের কার্যালয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ানোর বহু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ছিল হারুনের জনসংযোগ বাড়ানোর কৌশল, যার আড়ালে চলত ক্ষমতার অপব্যবহার। এর আগে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে এসপি থাকাকালে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও জমি দখল থেকে শুরু করে সব অপকর্মে জড়িয়েছিলেন পুলিশের সাবেক এই কর্মকর্তা।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার থাকাকালে পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাসেমের ছেলে এবং আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী-সন্তানকে ধরে নেওয়ার ঘটনাও দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। অভিযোগ ছিল, চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে এমন পদক্ষেপ নেন হারুন।

আরো যত অভিযোগ

Manual5 Ad Code

হারুনের বিরুদ্ধে আরো বহু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আছে—বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরে এনে নির্যাতন; আন্দোলন দমনে ‘বোমা উদ্ধারের’ নাটক সাজানো; হেফাজতে নির্যাতন; আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়; ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি; অপহরণ, বেআইনিভাবে আটকে রাখা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি। তবে এত সব অপকর্ম করেও সব সময় থেকেছেন অধরা। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের প্রশ্রয়ে তিনি বেয়াড়া হয়ে ওঠেন। যোগ্যতা না থাকলেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ইশারায় হারুনকে ডিআইজি করে ডিবি প্রধান করা হয়।

সমন্বয়কদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ

২০২৪ সালের ৩১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ককে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন হারুন। এ ছাড়া সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর তাঁকে ডিবি প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর কদিন পরই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং আত্মগোপনে চলে যান তিনি।

১৮৫টি মামলা, তবু অধরা

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলছে, সরকার পতনের পর হারুনের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে অন্তত ১৮৫টি মামলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হারুনের অতীত অপকর্ম ও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কেন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

প্রশ্ন উঠেছে, এত অভিযোগ, এত মামলা, শতকোটি টাকার সম্পদ জব্দের পরও কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে ডিবি হারুন? বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান, প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং দেশের বাইরে অবস্থান—এই তিন কারণে এখনো আইনের নাগালের বাইরে হারুন।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। দোষী হোক কিংবা নির্দোষ, দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় বাহিনীর সদস্যদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, একসময়ের ক্ষমতাধর ডিবি প্রধান হারুন নিজেই দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বহুমুখী তদন্তের মুখে। দুদকের একের পর এক জব্দ অভিযান ও সম্পদ অনুসন্ধান ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামনে তাঁর বিরুদ্ধে আরো বিস্ফোরক তথ্য বেরিয়ে আসবে। ফলে জনমনে একটাই প্রশ্ন—শত শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য, দেড় শতাধিক মামলা এবং অভিযোগের পাহাড় নিয়েও ‘ডিবি হারুন’ কি শেষ পর্যন্ত আইনের মুখোমুখি হবেন, নাকি অধরাই থেকে যাবেন?

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code