ঢেলে সাজানো হচ্ছে প্রশাসন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এই সময়ের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার ভিত্তিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় মনে করছে, কেবল বদলি, পদায়ন বা কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা সম্ভব নয়। এ প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দক্ষতা, সততা, পেশাদারত্ব ও মেধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে দায়িত্ব বণ্টনের প্রস্তুতি চলছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে কর্মদক্ষতা, সততা, অতীতের প্রশাসনিক ভূমিকা এবং নীতিনিষ্ঠার ভিত্তিতে। কারা মাঠ প্রশাসনে সফল, কারা নীতি বাস্তবায়নে দক্ষতা দেখিয়েছেন, কার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছেÑ এসব তথ্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত বা বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার চিন্তাও রয়েছে। কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘১৮০ দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রশাসনে দ্বিতীয় ধাপের পুনর্বিন্যাস শুরু হতে পারে। এবার মূল বিবেচনা হবে মেধা, সততা ও কাজের সক্ষমতা। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
Manual7 Ad Code
১৮০ দিনের কর্মসূচির মূল্যায়ন
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকার প্রশাসনকে গতিশীল করতে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করে। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়ানো, নীতিনির্ধারণে সমন্বয় তৈরি এবং মাঠ প্রশাসনকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বিশেষ নির্দেশনাও পাঠানো হয়। তবে ছয় মাসের মূল্যায়নে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প, নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজেট বাস্তবায়ন ও ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ধীরগতি রয়ে গেছে। একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনের কিছু অংশ এখনও আগের কর্মসংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ফলে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘নীতি নির্ধারণ যত দ্রুত হচ্ছে, বাস্তবায়নের গতি ততটা নয়। কোথাও সমন্বয়ের ঘাটতি, কোথাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনীহা, আবার কোথাও প্রশাসনিক জড়তা কাজ করছে।’
এবার মেধাভিত্তিক পদায়নের প্রস্তুতি
সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্রশাসন পুনর্গঠনের দ্বিতীয় ধাপে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মদক্ষতা, দুর্নীতিমুক্ত কর্মজীবন, মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (পিডিএস), অতীতের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
Manual6 Ad Code
জানা গেছে, জনপ্রশাসন উপদেষ্টা, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এ তালিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে সচিবালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর এবং মাঠ প্রশাসনে নতুন পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ফেরানোর চিন্তা
সরকারি সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদোন্নতি না পাওয়া বা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে থাকা কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে। প্রয়োজনে তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, কমিশন কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, প্রশাসনে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে কার্যকর নেতৃত্ব তৈরি করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
Manual6 Ad Code
উল্লেখ্য, সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, অতীতের বিভাজন ভুলে প্রশাসনকে পেশাদার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে দক্ষতা, সততা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রশাসনের গতি কেন থমকে
সরকারের একাধিক পর্যায়ের কর্মকর্তা বলছেন, প্রশাসনের ধীরগতির পেছনে শুধু ব্যক্তি নয়, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতিও দায়ী। অভিযোগ গত এক দশকের বেশি সময় ধরে পদোন্নতি, পদায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব ছিল। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সংস্কৃতির প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। অনেক কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঝুঁকি নিতে চান না, আবার কেউ কেউ অতীতের প্রশাসনিক ধারা থেকেই বের হতে পারছেন না। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত হলেও বাস্তবায়নের গতি সেই তুলনায় ধীর হয়ে পড়েছে।
Manual7 Ad Code
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পেশাদার ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে পদায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও সেদিকেই।’
রাজনৈতিক প্রভাব প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে প্রশাসনে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি মেধাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। পোস্টিং, প্রমোশন কিংবা নিয়োগÑ কোনোটিই যেন অযৌক্তিক প্রভাবের শিকার না হয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’ তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বাস্তবতা এক দিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
সচিব পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আধিক্য
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮১ জন কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য, পরিবেশ, কৃষি বিপণন, ট্রেড মার্কস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোসহ একাধিক দপ্তরে নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এনটিআরসিএ, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব নিয়োগ প্রশাসনের দ্বিতীয় ধাপের পুনর্বিন্যাসেরই অংশ।
যোগ্য কর্মকর্তা খুঁজে বের করাও দক্ষতার কাজ
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক মনে করেন, শুধু বদলি বা পদায়ন দিয়ে প্রশাসনের কাঠামোগত সমস্যা দূর হবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রকৃত অর্থে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা। তিনি বলেন, ‘যোগ্য কর্মকর্তাকে বেছে নেওয়ার কাজটিও দক্ষ মানুষের হাতে থাকতে হবে। কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন, কর্মদক্ষতা, দুর্নীতির অভিযোগ, মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।’
সামনে কঠিন পরীক্ষা
নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রশাসনে গতি ফেরাতে এবার ব্যক্তি পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তনেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন সরকার প্রশাসনের দ্বিতীয় ধাপের পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসনÑ বিভিন্ন স্তরে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে, সেগুলোই বলে দেবে প্রশাসনে গতি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব রূপ পাচ্ছে।