রাজধানীতে শনিবার (১ আগস্ট) একই সময়ে দুটি স্থানে বোমাতঙ্ক দেখা দেয়। পরে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, উদ্ধার হওয়া বস্তু দুটি বোমা নয়। তবে গত এক সপ্তাহে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ করে বোমা আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে কেন?
সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ দুটি পরিত্যক্ত বস্তু পাওয়া যায়। বস্তু দুটি দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগেও মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি কার্যকর আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) উদ্ধার হয়। এছাড়া আশুলিয়ায় একটি চায়ের দোকানে ফেলে যাওয়া ব্যাগের ভেতর থেকেও প্রেসারকুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর জনমনে উদ্বেগ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হঠাৎ বোমাতঙ্কের পেছনে মূলত সন্দেহজনক পরিত্যক্ত বস্তু (যেমন ব্যাগ বা বস্তা), ভুয়া তথ্য বা গুজব এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির কুপ্রবণতা কাজ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা কিংবা জনবহুল এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া আইইডির ঘটনাকে পুলিশ সম্ভাব্য নাশকতার চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছে।
পুলিশ বলছে, জনসমাগম এলাকায় কোনো পরিত্যক্ত বস্তু পড়ে থাকতে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন বস্তু ফেলে যেতে পারেন। তবে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
Manual7 Ad Code
আজকের দুই ঘটনায় যা পাওয়া গেলো
Manual7 Ad Code
শনিবার সকালে রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ দুটি পরিত্যক্ত বস্তু পাওয়ার খবরে জনমনে সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
প্রথমে মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনে বোমাসদৃশ বস্তু রয়েছে—এমন সংবাদের ভিত্তিতে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে। সন্দেহজনক ব্যাগটি এক্স-রে পরীক্ষায় ভেতরে কৌটাসদৃশ একটি ইমেজ দেখতে পায়। পরে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুসরণ করে ফ্র্যাঞ্জিবল ডিসরাপ্টর ব্যবহার করে নিরাপদে বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর ব্যাগটি খুলে দেখা যায়, ভেতরে ছিল জর্দার একটি কৌটা ও পান। কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর বস্তু পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে, তেজগাঁও থানাধীন ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত বস্তাকে কেন্দ্র করে বোমা সন্দেহের সৃষ্টি হলে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়। সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হ্যান্ড এন্ট্রির মাধ্যমে বস্তাটি পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, বস্তার ভেতরে কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক বস্তু নেই।
Manual5 Ad Code
এর আগে যা ঘটেছে
গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে জেনারেটর রুমের পাশে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে একটি আইইডি বা পাইপ বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। সেদিন ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া উল্টোরথের শোভাযাত্রা ওই এলাকা অতিক্রম করার কথা ছিল। আনসার সদস্যদের সতর্কতায় ছাতার ভেতরে মিটমিট করে আলো জ্বলতে দেখে বিষয়টি শনাক্ত হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এড়াতে পুলিশ ঘটনাটি গোপন রেখে সেখানে ‘শর্ট সার্কিট’ হয়েছে বলে জানায়। পরে ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ডিভাইসটি নিষ্ক্রিয় করে।
সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসটি ছিল একটি পাইপ বোমা। এর ভেতরে সালফারজাতীয় বিস্ফোরক উপাদানের সঙ্গে বেয়ারিং বল, তারকাঁটা ও ধারালো লোহার টুকরো ছিল। ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সার্কিটের সঙ্গে ছাতার বোতাম সংযুক্ত ছিল। কেউ ছাতাটি খুলতে গেলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণের স্প্লিন্টারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পথচারী কর্মী আহত হন।
ঘটনার পর মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কে বা কারা ডিভাইসটি সেখানে রেখেছিল, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে এটিকে নাশকতার উদ্দেশ্যে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে ৩১ জুলাই আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চে রাখা পরিত্যক্ত ব্যাগের ভেতর থেকে প্রেসারকুকার আকৃতির একটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ডিএমপির বোমা ডিসপোজাল ইউনিট সেটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে। পুলিশ জানিয়েছে, কে বা কারা সেটি সেখানে রেখে গেছে এবং উদ্দেশ্য কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায়ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত চলছে।
আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান
ডিএমপির মিরপুর জোনের সহকারী কমিশনার আবুল বাশার বলেন, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে ধারণা করা হয়েছিল, সেখানে বিস্ফোরকজাতীয় কিছু থাকতে পারে। পরে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে কোনো বিস্ফোরক পাননি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সন্দেহজনক কোনো বস্তু পড়ে থাকতে দেখলে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত পুলিশকে জানানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Manual7 Ad Code
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দুটি ক্ষেত্রে বোমার খবর মিথ্যা প্রমাণিত হলেও মতিঝিলে কার্যকর আইইডি উদ্ধার এবং আশুলিয়ায় প্রেসারকুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জনসমাগমস্থলে ফেলে রাখা সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে সাধারণ মানুষকে সেটি স্পর্শ না করে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।