র্যাবের আয়নাঘরে ৭ ‘ডেথ সেল’, আরও যেসব নতুন তথ্য জানা গেলো
র্যাবের আয়নাঘরে ৭ ‘ডেথ সেল’, আরও যেসব নতুন তথ্য জানা গেলো
editor
প্রকাশিত আগস্ট ২, ২০২৬, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
Manual7 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল, যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত, পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারপতি। তাদের সঙ্গে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটরসহ প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা। পরিদর্শনকালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কীভাবে এবং কোথায় মানুষকে গুম করে রাখা হতো, সে বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।
টিএফআই সেলের অবস্থান
ঢাকার উত্তরায় বিমানবন্দর এলাকায় র্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে অস্ত্রাগারসংলগ্ন একটি পুরোনো দ্বিতল ভবনে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল অবস্থিত। এটি র্যাবের গোয়েন্দা শাখা (ইন্ট উইং)-এর পরিচালকের অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
কীভাবে ব্যবহার হতো
প্রাথমিকভাবে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্থাপনাটি নির্মিত হলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) এটি বলপূর্বক গুমের অন্যতম প্রধান বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিবরণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকার বলপূর্বক গুমকে কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করত। লক্ষ্য নির্ধারণ করে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যার অংশ হিসেবে কখনও র্যাব এককভাবে, আবার কখনও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হতো। টিএফআই সেলে আটক ব্যক্তিদের অনেক সময় অন্য গোপন বন্দিশালায়ও পাঠানো হতো।
শেখ হাসিনার শাসনামলে টিএফআই সেলের পুরো দায়িত্ব র্যাবের গোয়েন্দা শাখার (ইন্ট উইং) পরিচালকের অধীনে থাকায় অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। গোপনীয়তার স্বার্থে সেলটির কোডনেম ছিল ‘হাসপাতাল’।
২৯টি স্থায়ী সেল
দ্বিতল ভবনটিতে মোট ২৯টি স্থায়ী সেল রয়েছে।
নিচতলার একাংশে খোলা টয়লেটসহ ১০টি সেল রয়েছে, যেগুলোর গড় আয়তন প্রায় ৫ ফুট × ৮ ফুট। একই তলায় সৈনিক ব্যারাকের মতো একটি অংশ ছিল, যেখানে টিএফআই সেলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত র্যাব সদস্যরা থাকতেন।
দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি সেল রয়েছে, যেগুলোর গড় আয়তন প্রায় ১৪ ফুট × ৪/৫ ফুট। একই তলায় দুটি বড় সেল ছিল, যেগুলোকে তথাকথিত ‘ভিআইপি সেল’ বলা হতো। এর একটির আয়তন প্রায় ১৪ ফুট × ১০ ফুট এবং অন্যটির প্রায় ১০ ফুট × ১০ ফুট। দুটি সেলের সঙ্গে ছোট দুটি টয়লেট রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় টিএফআই সেলের পাশাপাশি র্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের কয়েকটি অফিস কক্ষও রয়েছে।
সাতটি ‘ডেথ সেল’
টিএফআই সেলের প্রবেশমুখের সিঁড়ির কাছে খোলা টয়লেটসহ অতিসংকীর্ণ সাতটি সেল রয়েছে, যেগুলোর গড় আয়তন প্রায় ২ ফুট × ৪ ফুট। এগুলোকে ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ বলা হতো।
Manual6 Ad Code
ভিকটিমের সংখ্যা বেড়ে গেলে দ্বিতীয় তলার খোলা অংশ বা করিডোরে ক্যানভাস বা কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে তৈরি অস্থায়ী সেলেও তাদের রাখা হতো।
নির্যাতনের জন্য বিশেষ কক্ষ
স্থাপনাটিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনটি সাউন্ডপ্রুফ বিশেষ কক্ষ ছিল। এসব কক্ষ ভিকটিমদের, যাদের ‘সাবজেক্ট’ নামে ডাকা হতো, নির্যাতনের বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সজ্জিত ছিল।
এর মধ্যে ছিল ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, যেখানে বন্দিদের বসিয়ে বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে দ্রুত ঘোরানো হতো। ছিল বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে নির্যাতনের ব্যবস্থা এবং মই-সদৃশ লোহার বেড, যেখানে বন্দিদের বেঁধে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করা হতো। অনেক সময় ধীরগতিতে ঘুরিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হতো।
এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে কাটা হাত, উপড়ে ফেলা চোখ এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের বিভৎস ছবি টাঙিয়ে রাখা হতো।
Manual1 Ad Code
আলামত নষ্টের অভিযোগ
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, স্থাপনাটির দেয়াল, দরজা, জানালাসহ সামগ্রিক কাঠামো পরিবর্তন করে বলপূর্বক গুমের সাক্ষ্যপ্রমাণের অনেকাংশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নষ্ট করা হয়েছে।
যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্ত সংস্থা কাজ শুরু করার সময় সেখানে একটি ক্যামোফ্লেজ তৈরি করা হয়েছিল। ফলে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে বন্দিশালার মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তদন্তে দেখা যায়, কয়েকটি জায়গা দেয়াল তুলে আড়াল করা হয়েছে। দেয়াল সরানোর পর ২২টি কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি বলেন, এসব কক্ষের নিচে একটি ডেথ সেলও রয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানে ২৯টি কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় তৎকালীন সংশ্লিষ্টদের দায় রয়েছে এবং তাদের জবাব দিতে হবে। পাশাপাশি পরে যারা দেয়াল তুলে আয়নাঘর আড়াল করেছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে।
Manual6 Ad Code
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত ভয়াবহ। ছোট-বড় ২৯টি কামরা বা সেল পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভিন্ন মতের মানুষকে সেখানে বছরের পর বছর আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন করা হতো। কাউকে দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হতো। বহু মানুষকে হত্যার পর মরদেহ গুম করে ফেলা হতো।
Manual1 Ad Code
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উদ্ধার হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান অন্যতম। এর পরিপ্রেক্ষিতে টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার বিচার চলছে।
তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত গুম ও হত্যার শিকার ২৫০ জনের বেশি মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে ইলিয়াস আলী ও সুমনও রয়েছেন।