গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে পাঁচ মাস হলো। রাজনৈতিক এই পালাবদলের পর অনেকের প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘদিনের সংঘাতময় রাজনীতির বাতাবরণ থেকে বেরিয়ে এসে দেশ সহনশীল রাজনৈতিক ধারায় ধাবিত হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ক্রমশই অন্যরকম হয়ে উঠছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে অস্থিতিশীলতা, উত্তেজনা ও সংঘাত। পদযাত্রা, সমাবেশ, পথসভা, পাল্টা কর্মসূচি, হামলা, ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আবেদনকে রাজনৈতিকভাবে ধারণ ও উদযাপনের লক্ষ্য সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে সেমিনার, মানববন্ধন, পদযাত্রা, আলোচনা সভা, প্রদর্শনী এবং ৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় সমাবেশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সময় জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) বিভিন্ন জেলায় সাংগঠনিক কর্মসূচি ও জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
Manual8 Ad Code
জামায়াতের কর্মসূচিগুলো মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও এনসিপির কর্মসূচিতে কোথাও হামলার অভিযোগ, কোথাও মিছিলে বাধা, কোথাও আবার ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সিলেটে শহীদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ফেরার পথে উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয় সারজিস আলমের গাড়ি বহরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হবিগঞ্জে হামলার ঘটনায় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাদের নামে মামলা করেছে এনসিপি। এর আগে ঝিনাইদহ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হবিগঞ্জে সংঘাত এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাচনের সময় ও তার পর রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় বড় পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কেবল সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সৃষ্টি, সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার এবং জনসমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এ অভ্যুত্থানে কার ভূমিকা কতটা ছিল এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্র গঠনে কার রাজনৈতিক অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে উত্তরোত্তর দ্বন্দ্ব-বিতর্ক বাড়ছে।
Manual2 Ad Code
রাজনীতিতে মতপার্থক্যের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চারটি সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে হ্যাঁ-না ভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। যাতে বলা হয়, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দ্বৈত ভূমিকা পালন করবেন। তারা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা। কিন্তু জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধানে অস্তিত্বহীন এই পরিষদে শপথ নিতে অস্বীকার করে বিএনপি জোট। যে অধ্যাদেশের আলোকে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস না করায় তা বাতিলও হয়ে গেছে। এভাবে একই যাত্রায় দুই গন্তব্যের মুখোমুখি হয় দেশবাসী। বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করলেও তাতে যোগ দেয়নি জামায়াত-এনসিপি জোট।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংঘাতের খতিয়ান
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২২ মাসে দেশে ৯৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে ৯ হাজার ৭৯৫ জন এবং নিহত হয়েছে ২১৩ জন। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৬৪টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে ১ হাজার ৫২৫ জন। নিহত হয়েছে ১২ জন। বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে ১৯৭ জন।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের মনিটরিং প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৬-এর জুন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব ভায়োলেন্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক গ্রেপ্তার, অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার এবং সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সূচকে উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মে মাসের তুলনায় জুন মাসে সহিংসতা অব্যাহতভাবে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। নিহতের সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও আহতের সংখ্যা ৭৭ শতাংশ বেড়েছে, যা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। মে মাসে মব ভায়োলেন্সে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২, যা জুনে বেড়ে ৩৩ হয়েছে। অন্যদিকে মে মাসে এ ধরনের অপরাধে আহত হয়েছে ৭১ জন, জুনে তা বেড়ে ১২৬ হয়েছে।
সংগঠনটি বলছে, জুনে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা ৫৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় এবং নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়ার অর্থ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ সহিংস ও অনিরাপদ হচ্ছে। জুনে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছে ৩০৩ ও নিহত হয়েছে ৭ জন। মে মাসে যা ছিল যথাক্রমে ১৯৩ ও ৩ জন। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ২০২৪ সালের সরকার পতন-পরবর্তী মামলাসমূহে গ্রেপ্তারের সংখ্যা মে মাসের তুলনায় জুনে সাতগুণেরও বেশি বেড়েছে।
২০২৪-এর সরকার পতন-পরবর্তী মামলায় মে মাসে গ্রেপ্তার হয়েছে ৬৫ জন, যা জুনে বেড়ে ৪৭৩ হয়েছে। সংগঠনটি বলছে, এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা দমনমূলক ব্যবস্থার আশঙ্কার সংকেত দেয় এবং বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমএসএফ জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে মৃত্যু এবং কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধিও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিকে আরও স্পষ্ট করে। জুন মাসে প্রথমবারের মতো হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা এবং কারাগারে মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া (৭ থেকে ৯) উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের মতপ্রকাশ সভ্য ভাষায় হওয়া উচিত। রাজনীতিতে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা ও বিতর্ক থাকবে। তা যেন সংঘাতের দিকে না যায়। সবাইকে সহনশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে জুলাইয়ের পটভূমি তৈরি হয়েছিল। জুলাইকে বিএনপি স্মরণ ও শ্রদ্ধা করে।’
Manual7 Ad Code
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে দেশকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। জাতিকে রাজপথে ঠেলে না দিয়ে দ্রুত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকার জুলাই সনদের মূল চেতনা থেকে সরে গিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে। রক্তঝরা জুলাই আন্দোলনের সুফল ভোগ করে যারা আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদেরই উচিত গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংঘাত কখনোই দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষকে স্থায়ী রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়নি। বিভিন্ন গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক সংকট ও গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি অধ্যায়ই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান, সাংবিধানিক পরিবর্তন অথবা নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সহিংসতা নয়, বরং রাজনৈতিক সংলাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানই টেকসই পথ। সরকার ও বিরোধী দলকে সে পথেই হাঁটতে হবে।