প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৪ঠা রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে সরকার

editor
প্রকাশিত আগস্ট ১৭, ২০২৬, ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে সরকার

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০২৭ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন বিষয় চালু, ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষা সম্প্রসারণ, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে এসব উদ্যোগের বেশিরভাগই ঘোষণা, নীতিগত সিদ্ধান্ত বা প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। তবে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই পরিমার্জন ও চারটি নতুন বিষয় যুক্ত করার কাজ এগোচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রম, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার, তৃতীয় ভাষা, ব্রিজ কোর্স, পাবলিক ড্যাশবোর্ডসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ যুক্ত করা হবে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, সৃজনশীল ও ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য বলে জানিয়েছে সরকার।

২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম

২০২৮ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, কয়েক মাসের মধ্যে পুরো শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই ২০২৭ সালের বইয়ে প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন করা হবে। এরপর ২০২৮ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ নতুন শিক্ষাক্রম চালুর কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন শিক্ষাক্রমে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে শিখনফল অর্জন, জ্ঞান প্রয়োগ এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন, বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাক্রম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৭ সালের বইয়ে পরিবর্তন

২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রমের আগে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইতিহাস, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং নতুন চার বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বই পরিমার্জনের কাজ চলছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ এবং ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’সহ কয়েকটি বইয়ে নতুন বিষয় যুক্ত ও ব্যাপক পরিমার্জনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার জানিয়েছে, ২০২৭ সালের পরিবর্তনকে পূর্ণাঙ্গ নতুন শিক্ষাক্রম হিসেবে দেখা হবে না; এটি হবে বৃহত্তর সংস্কারের প্রস্তুতিপর্ব।

শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের অঙ্গীকার

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে নেওয়ার নির্বাচনি অঙ্গীকার করেছে সরকার। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ১২ দফা নীতিগত এজেন্ডা ঘোষণা করে এ কথা জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির দেড় থেকে দুই শতাংশের মধ্যে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের লক্ষ্য রয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মাইলস্টোনভিত্তিক পরিকল্পনা, ই-জিপি ও আগাম ক্রয় পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থের কার্যকর ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

গত ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রথমবারের মতো জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ও ঝরে পড়া রোধে এ বরাদ্দ ব্যবহারের কথা জানান তিনি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে (এসইডিপি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে ৩ হাজার ৫৯৯ কোটি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ৬০০ কোটি টাকা। এসইডিপির আওতায় ১০টি স্কিম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি স্কিম ন্যাশনাল কারিকুলাম ডিসেমিনেশন ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত।

লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রকল্পের আওতায় শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য ৮১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ২১ জন শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সংশ্লিষ্ট জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রশিক্ষণের মধ্যে বেসিক ট্রেনিং, বিষয়ভিত্তিক প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের লিডারশিপ ট্রেনিং, ভোকেশনাল শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ব্লেন্ডেড লার্নিং, আইসিটি, লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও বুলিং প্রতিরোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রশিক্ষণ রয়েছে।

যেসব উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’: শিক্ষকদের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে ডিজিটাল পাঠপরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

Manual3 Ad Code

স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং সাইবার নিরাপত্তাকেও সক্ষমতা হিসেবে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মাধ্যমিক থেকেই কারিগরি শিক্ষা: মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এক শিক্ষা ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার সুযোগ সহজ করতে ‘স্কিল ক্রেডিট’ ও ‘ব্রিজ কোর্স’ চালুর কথাও সরকারের ১২ দফা এজেন্ডায় রয়েছে।

বিগত সরকারের সময়ে সাধারণ শিক্ষায় দুটি কারিগরি বা বৃত্তিমূলক ট্রেড চালু করা হয়েছিল।

রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার: মাধ্যমিক পর্যায় থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকল্পভিত্তিক কাজ ও প্রযুক্তি-সাক্ষরতার ওপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। নির্বাচিত বিদ্যালয়ে ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রযুক্তি শেখানো ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় ভাষা শিক্ষা: বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, চীনা, জাপানি ও ফরাসির মতো তৃতীয় ভাষা ধাপে ধাপে শেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষক, পাঠ্যসামগ্রী ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রস্তুত করে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে চীনা ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। গত ৪ আগস্ট ইউজিসি কার্যালয়ে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস এবং চীনের জিয়াংসি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটির ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা জানান।

পরীক্ষা ও মূল্যায়নে পরিবর্তন: মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা মূল্যায়নে লার্নিং ট্রাজেক্টরি, কনসেপ্ট ম্যাপ ও আইটেম ব্যাংক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোন শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কী শিখবে এবং পরবর্তী শ্রেণিতে সেই শেখার ধারাবাহিকতা কীভাবে এগোবে, তা নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে। এতে পরীক্ষা তথ্য মনে রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণ, প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা মূল্যায়নের দিকে যাবে।

শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধা: বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ দ্রুত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগামী ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় জেলা প্রশাসকদের কাছে তালিকা থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আইবাস ও ইএফটির মাধ্যমে অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের নামে টাকা ট্রান্সফার করা হবে।

তিনি জানান, কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পাবেন ৪৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। আর অবসর সুবিধা বোর্ডের টাকা দেওয়া হবে ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে।

এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক জানিয়েছিলেন, বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষকদের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হবে।

Manual2 Ad Code

সব ধারার শিক্ষায় ন্যূনতম শিখন মান: সরকারি-বেসরকারি স্কুল, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষার মধ্যে কাঠামোগত পার্থক্য থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ন্যূনতম শিখন মানদণ্ড নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন ভিন্ন হলেও শিক্ষার্থীর মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতার মানে বড় ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়।

খেলাধুলা ও মানসিক বিকাশ: শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের সময়সূচিতে খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ট্যালেন্ট হান্ট ও স্কুল লীগ আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মিড-ডে মিল ও স্বাস্থ্যসেবা: প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতে সারা দেশে মিড-ডে মিল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় স্কুল ফিডিং বা মিড-ডে মিল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

Manual2 Ad Code

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর সেপ্টেম্বরে দেশের ৬২ জেলার ১৫০টি উপজেলায় ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হয়। গত ৮ এপ্রিল শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূর ও পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে মিড-ডে মিল চালু করা হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই দেশের সব স্কুলে এটি চালুর পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।

এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্ন টয়লেট, ছাত্রীদের উপযোগী স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সারা দেশের শিশুদের স্কুল ড্রেস, জামা ও জুতো দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিনামূল্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা: বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইনোভেশন গ্র্যান্ট, শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট লোন এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষায় সহায়তার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

শিল্প ও অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ বাড়াতে ইন্টার্নশিপ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্যারিয়ার সেন্টার চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহি: শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পাবলিক ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি, বই বিতরণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাসের ঘণ্টাসহ বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের কথা বলা হয়েছে।

তিন ধাপে সংস্কার: সরকারের ১২ দফা শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা তিন ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। প্রথম ধাপে বাজেট বিশ্লেষণ ও পাইলট প্রকল্প, দ্বিতীয় ধাপে জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ এবং তৃতীয় ধাপে পরীক্ষা সংস্কার ও গবেষণা সহায়তার মতো কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

১৮০ দিনে অগ্রগতি কতটা

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সময় পুরো রাষ্ট্রকে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত যে খাত, সেটা শিক্ষা ব্যবস্থা। আমরা সেখান থেকে অ্যাকাডেমিক কারিকুলামে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন ও সংস্কারের কাজ করছি।’

তিনি বলেন, ‘আগামী শিক্ষাবর্ষে হয়তো সব পরিবর্তন একবারে করা সম্ভব হবে না। আমরা বেশ কিছু নতুন কারিকুলাম পরিবর্তন করছি। এরই মধ্যে চারটি নতুন বই যুক্ত করছি।’

মাহ্‌দী আমিন বলেন, ‘ইতিপূর্বে প্রথমবারের মতো আমরা বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছি। সারা বাংলাদেশের তৃণমূল থেকে ঢাকা পর্যন্ত এক প্ল্যাটফর্মে এসে বেশ কিছু প্রতিযোগিতা করেছি। ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আমরা ফুটবল টুর্নামেন্ট করেছি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম দেখেছি। ইনোভেশন, গ্র্যান্ট ও স্টার্টআপ কম্পিটিশনে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা বৃক্ষরোপণ করেছি। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কীভাবে বাড়ানো যায়, শিক্ষা কার্যক্রমে কীভাবে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে সন্নিবেশ করা যায় এবং শিক্ষা কার্যক্রমে প্রযুক্তির সমন্বয় কীভাবে করা যায়, এসব নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় আমাদের কাজ চলমান রয়েছে।’

মাহ্‌দী আমিন বলেন, ‘গত ১৬ বছরের ভেঙে পড়া রাষ্ট্র কাঠামো হয়তো পাঁচ-ছয় মাসের আমলে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে বহুপক্ষীয় আলোচনা, ডায়ালগ ও কনসালটেশনের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন আমরা নিশ্চিত করব।’

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী পাঠ্যপুস্তকে নতুন সংযোজনের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তা শুধু বইয়ে সীমাবদ্ধ না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাবো। তবে এই পরিবর্তন শিক্ষাক্রমেও প্রতিফলন হতে হবে, পাঠ্যপুস্তকেই যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে। পরিবর্তন সংস্কার সার্থক করার জন্য অংশীজন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।’

Manual6 Ad Code

কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হাতে-কলমে চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষা কিংবা খেলাধুলা শুধু শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পঠনপাঠনের বিষয় না। প্র্যাকটিসের ব্যাপার আছে। সংস্কৃতি শুধু পড়ার বিষয় নয়, চর্চার বিষয়। কারিগরি বিষয়টাও চর্চার বিষয়। হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে না পারলে কোনও লাভ নেই।’

কারিকুলাম পরিবর্তনের বিষয়ে রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘উদ্বেগের জায়গা হলো শিক্ষার্থীর জন্য যে ভারী না হয়ে যায়। বাচ্চাদের গ্রহণযোগ্য বয়সের সঙ্গে বিষয়ের মিল থাকতে হবে। দশ বছরের বাচ্চাকে আপনি ১৫ বছরের বিদ্যা দিলে তো হবে না।’

শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা খাতকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে ১২ দফার একটি সমন্বিত শিক্ষা সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, বাজেট বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং বিশ্বমানের কর্মসংস্থানমুখী মানবসম্পদ গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়।’

তিনি বলেন, ‘২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন পাঠ্যবই সংযোজনের উদ্যোগও প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।’

তবে শিক্ষা সংস্কারের সফলতা বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যাশা করি, যেখানে নীতি নির্ধারণ, পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন, প্রতিটি স্তরেই প্রশিক্ষিত ও বিশেষায়িত মানবসম্পদ থাকবে।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code