প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৪ঠা রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

পাচারের টাকা ফেরাতে তোড়জোড়

editor
প্রকাশিত আগস্ট ১৭, ২০২৬, ১২:০৬ অপরাহ্ণ
পাচারের টাকা ফেরাতে তোড়জোড়

Manual3 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান সরকার। এ বিষয়ে গত ৬ মাসে সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে। সবশেষ পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে লবিস্ট হিসেবে ৮টি ল-ফার্ম নিয়োগ করা। বাংলাদেশের ৪২টি প্রতিষ্ঠানের পাচার করা টাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়ে তোলা সম্পদ সণাক্ত করতে করবে এই ফার্মগুলো।

বিগত সরকারের সময়ে বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে গঠিত আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স পুনর্গঠন ও কার্যকর করা হয়। টাস্কফোর্সের আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের ১০টি প্রতিষ্ঠান ও দুই ব্যক্তি অর্থ পাচারের তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সমন্বয়ে যৌথ তদন্ত দল (জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম-জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।

এই জেআইটির কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ৬ মাসে সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য ২৩টি দেশে ৪৪টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ (মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল এসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট-এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ইতোমধ্যে বিদেশে অর্থ পাচারকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশের ৪২টি প্রতিষ্ঠান।

Manual3 Ad Code

এসব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নামে বিদেশে থাকা সম্পদ খুঁজতে এবং সেসব অর্থ-সম্পদ ফিরিয়ে আনতে আইনি সহায়তার জন্য লবিস্ট হিসেবে ৮টি আন্তর্জাতিক ল-ফার্মকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

এদিকে, গত বছর জুন মাস পর্যন্ত প্রায় দেড় যুগে অর্থ পাচারের তথ্য চেয়ে বিশ্বের ৭১টি দেশে শতাধিক এমএলএআর পাঠিয়েছে দুদক। এর মধ্যে জবাব এসেছে ২৭টির।

দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১০টি দেশে পাচার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সেগুলো হলো- কানাডা, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড। এমএলআরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে দুদক। আইনি ব্যবস্থা নিতে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ অপরিহার্য। তাই প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণের অভাবে বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন রয়েছে ১৫৭টি অনুসন্ধান। এখন সেসব তথ্যের অপেক্ষায় আছেন দুদক কর্মকর্তারা।

Manual6 Ad Code

এমএলএআরের মাধ্যমে তথ্য পেলে অন্তত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব। এমএলএআর প্রক্রিয়াটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাদের সেসব দেশ ভ্রমণে পাঠানো হতে পারে। পাশাপাশি পাচারের টাকা ফেরাতে সব রকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

Manual1 Ad Code

অবশ্য পাচারের টাকা ফেরাতে গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই), জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে দুদক।

দুদকের শীর্ষস্থানীয় একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে পাচার হওয়া টাকার প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারায় এখনো অর্থ পাচারসংক্রান্ত দেড় শতাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান অনিষ্পন্ন রয়েছে। ফলে তদন্ত কর্মকর্তাদের সেসব দেশে পাঠিয়ে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকায় বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার চাইলে দুদক ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর (২০২৫) জুন মাস পর্যন্ত বিদেশে অর্থ পাচারসংক্রান্ত অন্তত ১৫৭টি মামলা অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৪৮টি মামলা অনিষ্পন্ন ছিল। অর্থ পাচার রোধ ও পাচার হওয়া টাকা ফেরাতে ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলেই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ ধরনের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। দুদকের এমএলএআর পাঠানো হয় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মাধ্যমে এবং এর জবাবও আসে একই মাধ্যমে।

এমএলএআর-এ বলা হয়, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করে সেসব দেশে অর্থসম্পদ গড়ে তুলেছেন, যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। দুদক অর্থ পাচারের অভিযোগে সেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে, সংশ্লিষ্ট দেশে অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির নামে-বেনামে থাকা অর্থসম্পদের দালিলিক তথ্য পাওয়া গেলে বিচারকাজে সহায়ক হবে।

Manual5 Ad Code

এ প্রক্রিয়ায় প্রায় দেড় যুগ আগে কানাডা, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বিভিন্ন দেশে তথ্য উপাত্ত চেয়ে এমএলএআর পাঠায় দুদক। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ টাকা পাচারের শীর্ষ ১০ দেশসহ নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, ভারত, লুক্সেমবার্গ, বারমুডাসহ ৭১ দেশের তালিকা করা হয় এবং সেসব দেশে এমএলএআর পাঠানো হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থ পাচারের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী-এমপি, সাবেক আমলা ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এসবের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অধিকাংশের বিরুদ্ধে এখনো অনুসন্ধান চলছে।

যৌথ তদন্ত দলের কার্যক্রম জোরদার

দেশের বৃহৎ ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য আন্তসংস্থা টাস্কফোর্সের অধীনে ১০টি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে একজন দলনেতা ও দুজন করে সদস্য রয়েছে। আন্তসংস্থা টাস্কফোর্সের সভাপতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। সাচিবিক সহায়তা দিতে সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান।

 

৬ মাসে ২৩ দেশে ৪৪টি এমএলএআর

পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে বর্তমান সরকারের মাধ্যমে গত ৬ মাসে ২৩টি দেশে ৪৪টি এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে গত এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স রয়েছে। টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলা চিহ্নিত করা হয়।

 

বিদেশে ৪২ প্রতিষ্ঠানের সম্পদ খুঁজতে ৮টি ল-ফার্ম নিয়োগ

২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে উদ্দেশ্য করে বিদেশে তাদের সম্পদ খুঁজতে ও সেগুলো ফেরাতে আইনি সহায়তা পেতে সম্প্রতি লবিস্ট হিসেবে আটটি আন্তর্জাতিক ল-ফার্ম নিয়োগ করেছে বর্তমান সরকার। এসব ফার্মের মাধ্যমে ৪২ প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের সম্পদ শনাক্ত করার পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ করে অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিয়োগ পাওয়া ল-ফার্মগুলো হলো- গ্রান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেল্লি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।

ল-ফার্মগুলো কোনো অগ্রিম ফি বা খরচ নেবে না। তারা বিদেশে থাকা সংশ্লিষ্ট সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার করতে পারলে উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে। অর্থাৎ, ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে ফার্মগুলো কাজ করবে। প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদের খোঁজ করবে ফার্মগুলো।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code