বিপুল বরাদ্দ ও উপবৃত্তিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। ২০১৮ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৭৩ লাখের বেশি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জনে। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৬৭ লাখ। তবে এ সময়ে শিক্ষার্থীসংখ্যায় ওঠানামা হয়েছে। ২০১৯ সালে সংখ্যা কমলেও ২০২২ সালে আবার বেড়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে বড় ধরনের পতন দেখা যায়।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার মান, কারিকুলাম পরিবর্তন, দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক বৈষম্য এর অন্যতম কারণ। সরকারি বিদ্যালয় থেকে কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কতজন কিন্ডারগার্টেন, মাদরাসা বা অন্য প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে- এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
শিক্ষার্থী ধরে রাখতে উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খাবার, স্কুল ব্যাগ, জুতা ও পোশাকসহ বিভিন্ন সুবিধাও দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারের বিপুল অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। তারপরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা বেড়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে শিক্ষার মান, পাঠ্যক্রমে ঘন ঘন পরিবর্তন, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বৈষম্যসহ নানা কারণে অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ের বদলে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছে। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কতজন অন্য ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে এবং কতজন পড়াশোনার বাইরে চলে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান (এপিএসএস) ২০২৪ অনুযায়ী দেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জন। মোট প্রাথমিক শিক্ষার্থীর প্রায় ৫২ দশমিক ৬০ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ছে। তবে কওমি ধারার শিক্ষার্থীদের তথ্য এ পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত নয়।
এদিকে ২০১৮ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন ৩ লাখ ৪৯ হাজার ২১৭ জন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৯ জনে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জনে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী কমলেও শিক্ষকসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যানের সংজ্ঞা ও হিসাবপদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা করোনা মহামারির আগেও দেখা যায়। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৭৩ লাখের বেশি। ২০১৯ সালে তা কমে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখে নামে। পরে ২০২২ সালে আবার বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখে দাঁড়ায়। কিন্তু ২০২৪ সালে তা আবার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১ কোটি ৬ লাখের কিছু বেশি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মজিবুর রহমান বলেন, এর বড় কারণ ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন। কারিকুলাম অল্প করে পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু ফিনল্যান্ড বা জাপানের কারিকুলাম বসিয়ে দিলেই শিক্ষার মান পরিবর্তন হয়ে যায় না। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো ব্লু-প্রিন্ট নেই। আমাদের দেশে আগে পাঠ্যবইয়ের কনটেন্ট পরিবর্তন করা হয়, এরপর কারিকুলাম। সব সরকার জনপ্রিয় ও চটকদার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে স্মার্ট বোর্ড নাকি স্মার্ট শিক্ষক কোনটি আগে দরকার। সরকারকে ঠিক করতে হবে কওমিতে কত শতাংশ শিক্ষার্থী পড়বে, সরকারি প্রাথমিকে কত আর অন্যগুলোতে কত শতাংশ পড়বে। গড়ে সব করতে গেলে কোনো লক্ষ্যই পূরণ হবে না।
Manual3 Ad Code
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পিইডিপি-৪-এর সমীক্ষায় শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে এসএসসি পাস ২ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং এইচএসসি পাস ৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক স্নাতক পাস। ১৪৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরাসরি পরিদর্শনের ভিত্তিতে এ তথ্য পাওয়া যায়। সমীক্ষায় বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতার কথাও উঠে এসেছে। প্রায় ১০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে অফিসকক্ষে বিদ্যুৎ থাকলেও শ্রেণিকক্ষে সংযোগ নেই।
Manual4 Ad Code
সমীক্ষায় সরাসরি পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীসংখ্যা কমার চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে এসব বিদ্যালয়ে গড়ে শিক্ষার্থী ছিল ২৯৪ দশমিক ৫১ জন। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৮৭ দশমিক ৭২ জনে। ২০২২ সালে গড় শিক্ষার্থী ছিল ২৮২ দশমিক ০৮ জন। ২০২৩ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ২৬৪ দশমিক ৬৮ জনে।
অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেনের বিস্তার ও শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধির চিত্রও বিভিন্ন পরিসংখ্যানে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালে দেশে কিন্ডারগার্টেন ছিল ১২ হাজার ৪৮৬টি। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৩৬৩টিতে। অর্থাৎ ছয় বছরে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৮১ হাজারের বেশি। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়ায়। এর মধ্যে প্রি-প্রাইমারিতে প্রায় ১১ লাখ ৯১ হাজার এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ২৮ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ছিল। ২০২৪ সালে দেশে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ২৯৯টি।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে বছরের পর বছর নানা কর্মসূচি ও বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও শিক্ষার্থী কমার কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি বিদ্যালয় থেকে কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কতজন কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা কিংবা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে এবং কতজন শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে চলে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান নেই।
এদিকে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শেখার অর্জন নিয়েও বিভিন্ন জাতীয় মূল্যায়নে ঘাটতির চিত্র পাওয়া গেছে। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে (এনএসএ) প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গণিতের বিভিন্ন দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। এসব মূল্যায়নে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনে কত শতাংশ শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে, তা উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নের নির্দিষ্ট ফলাফল ও সূচক অনুসরণ করা প্রয়োজন।
প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকার পিইডিপি-৪ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় পিইডিপি-৫ প্রকল্পের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণ ৫১ হাজার কোটি টাকার বেশি ধরা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসীকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ এর পর থেকেই প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা দেখা গেছে। কিন্তু তারা কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। অনুমান করা হয়, এসব শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ যাচ্ছে মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনে। ধর্মীয় কারণ, দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি ও শিক্ষায় বৈষম্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারের উচিত এ-সংক্রান্ত গবেষণা ও গভীর অনুসন্ধান করা।