প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১লা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

ফুটপাত যেন টাকার খনি

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৯:২২ পূর্বাহ্ণ
ফুটপাত যেন টাকার খনি

Manual4 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

সাধারণ মানুষের হাঁটাচলার জন্য ফুটপাত। অথচ সেই ফুটপাতের কিছু স্থানে অবৈধভাবে প্রতি ইঞ্চি জায়গার ‘ভাড়া’ হিসেবে গড়ে আদায় করা হতো ১ হাজার ২০০ টাকা! সে হিসাবে ফুটপাতের ৪ ফুট জায়গা নিয়ে দোকান বসালে ‘বিট ভাড়া’ বা ‘পজিশন’ ফি হিসেবে গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা দিতে হতো। এর বাইরে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে টেনে নেওয়া অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের ভাড়া এবং প্রতিদিনের কথিত টোল বাবদ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গড়ে আরও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিতে হতো। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের ফুটপাতে চাঁদাবাজি চলে আসছিল বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।

Manual2 Ad Code

 

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে মিরপুর-১০ গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় ফুটপাতের দোকানি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। তারা জানান, ওই এলাকায় শত শত ক্ষুদ্র দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা বা টোল আদায় করা হতো। পরে সেই টাকা স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও পেশাদার সন্ত্রাসী-মাস্তানদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হতো বলে তাদের অভিযোগ।

তাদের ভাষ্য, ‘এখানকার ফুটপাত তো টাকার খনি।’ এ কারণে বিভিন্ন পক্ষ মিলেমিশে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একসময়ে পুলিশও ফুটপাতের চাঁদার ভাগ নিত। তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর পুলিশকে সরাসরি ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করতে দেখেননি বা এমনটি শোনেননি বলে জানান তারা।

Manual5 Ad Code

গতকাল ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা জানান, মিরপুরে দোকানপ্রতি দৈনিক ‘লাইনম্যানকে’ ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক সংযোগের জন্য প্রতিদিন দিতে হয় ৪০ টাকা। ফুটপাতের আধিপত্য নিয়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্বও রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। বর্তমানে এখানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের চারটি গ্রুপ রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এসব গ্রুপের সবাই ফুটপাতের চাঁদার ভাগ নিতে চায়। অনেক সময় বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কয়েকটি গ্রুপের নেতারা ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজের সামনে থেকে ফুটপাত ধরে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এবং বিআরটিএ ভবন পর্যন্ত গতকালের উচ্ছেদ অভিযানের আগ পর্যন্ত শত শত দোকান বসত। সেখান থেকে লাইনম্যানের টোল, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা আদায় করত একটি প্রভাবশালী চক্র–এমন অভিযোগ রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের সড়কের পাশের ফুটপাতজুড়ে অবৈধ দোকান বসানো হতো। এতে পথচারীদের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হতো। এমনকি ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের প্রায় অর্ধেক জায়গা দখল করে ছয় সারিতে হকাররা দোকান বসাতেন। সেখান থেকেও স্থানীয় নেতা-কর্মীরা চাঁদা আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গতকাল রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতে গেলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) লোকজন ও পুলিশের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ হয়। এতে মিরপুরের ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

Manual8 Ad Code

নিজের নির্বাচনি এলাকার এই ঘটনার পর গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মাসের পর মাস ধরে একদল অসাধু ও চাঁদাবাজ ব্যক্তি এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা নিয়ে তাদের ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতা ও জনগণের ওপর পড়ে। তাই বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য কল্যাণকর, সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও টেকসই পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

এ প্রসঙ্গে গতকাল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মিরপুরের ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে এর আগেও দ্বন্দ্ব হয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও বিভিন্ন সময়ে এ এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণে পেশিশক্তির ব্যবহার করেছে।

ফুটপাতে শিশুদের কাপড় বিক্রি করেন মো. লিটন। তিনি বলেন, ‘আমার ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মালামাল শেষ। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ফুটপাতের দোকানে মাল তুলেছিলাম। এখন খাব কী, আর কিস্তিই বা কীভাবে দেব? ফুটপাতে বসে ব্যবসা করা অবৈধ, সেটা জানি। কিন্তু যে নেতা-কর্মীরা আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, প্রতিদিন চাঁদা নেন, তারা তো আরামেই আছেন। তাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফুটপাতের একজন কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, ‘ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে টাকা তোলেন লাইনম্যান কামরান। তিনি দোকানিদের কাছ থেকে টাকা তুলে তার ওপরের নেতাকে দেন। সেখান থেকে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-মাস্তানদের পকেটে যায়। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সব জানেন। কারও অজানা নয়। কিন্তু ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান হলে আমাদের মতো গরিবরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু নেতা-মাস্তানদের কিছু হয় না।’

ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন বলেন, ‘মিরপুরের ফুটপাত উচ্ছেদ করার আগে হকারদের বসার জন্য জায়গা করে দেওয়া দরকার ছিল। কারণ ফুটপাতে যারা হকারি ব্যবসা করেন, তারা সবাই গরিব। অনেকেই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মালামাল তুলেছেন। কেউ আবার ধার করে ব্যবসা করছেন।’

ফুটের জুতার দোকানি লিয়াকত বলেন, ‘যারা প্রতিদিন চাঁদা তোলে, তাদের না ধরে আমাদের ওপর বুলডোজার চালাইলে কেমনে হইব? ফুটপাতের ট্যাকা সব নেতাই খায়, আবার তারাই ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করতে আসে।’

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার বলেন, ‘মিরপুরের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা বা দখলের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী জড়িত রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে গতকাল মিরপুর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানে সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, ‘অবৈধভাবে কাউকে এখানে ফুটপাত দখল করতে দেব না। আজ প্রমাণ হয়েছে, মিরপুরের সাধারণ জনগণ ফুটপাত দখলমুক্ত চায়। কারও ইন্ধনে আবার ফুটপাত দখলের চেষ্টা করা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Manual6 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code