বিশ্ব অর্থনীতির নানা অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের মেঘ সরে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গতি ফেরার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
একই সঙ্গে স্থবিরতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রপ্তানি খাত এবং সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে কৃষিতে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের এই ইতিবাচক চিত্র দেশের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিমত্তা ও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা বৈধ পথে ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠিয়েছেন ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮ কোটি ডলার, যা প্রায় ৩ শতাংশ।
একক মাসের পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও প্রবাসী আয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে প্রবাসীরা মোট ৮৫৯ কোটি ১০ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৭৫৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১০০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা প্রায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
বাড়ছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও জুলাই-সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ৩১২ জনের। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ৯৫ হাজার ২২২ জন। এরপর সিঙ্গাপুর, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে কাজের সন্ধানে যথাক্রমে গেছেন ২৩ হাজার ৩৩৮ জন, ২১ হাজার ১৩৩ জন, ১২ হাজার ৬৯০ জন ও ১১ হাজার ৯৫৬ জন।
গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮৫৫ জনের। এর মধ্যে সৌদি আরবেই গিয়েছিলেন ২ লাখ ২ হাজার ৯৯৪ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছিল ৩২ হাজার ৮৯৪ জনের।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে মার্চেই জনশক্তি রপ্তানি অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। মার্চে রপ্তানি হয়েছিল ৪৪ হাজার ৬৫৮ জন, আর আগের বছরের মার্চে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছিল ১ লাখ ৫ হাজার ২৭ জন। মার্চের সেই নাজুক অবস্থা থেকে জনশক্তি রপ্তানি এখন ক্রমান্বয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈদেশিক কর্মসংস্থান যে হারে কমেছিল, সেখান থেকে কিছুটা বেড়েছে। সেই অর্থে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলা যায়। তবে এখনো জনশক্তি রপ্তানি কমই রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সদ্য সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য কমেছে। এমনকি পরিবারগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। ছয় মাস আগেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে হারে লোক গেছে, এখন আর সেই অবস্থায় নেই। তবে সৌদি আরবে আগের তুলনায় টেকনিক্যাল লোকের চাহিদা বেড়েছে। আগে বেশি হাউজকিপারের চাহিদা থাকলেও এখন ড্রাইভার বা এ ধরনের টেকনিক্যাল লোকের চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি নির্দিষ্ট বাজারনির্ভর হওয়ায় যুদ্ধ বা কোনো দুর্যোগে যেকোনো সময় সংকটে পড়তে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিকল্প বাজার খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়ে আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের শ্রমবাজার একমাত্র খোলা থাকায় সেখানে যাওয়ার হার কম-বেশি হওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। তবে নতুন বড় কোনো বাজার বা বিকল্প ক্ষেত্র তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ের খণ্ডিত বা নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির চাহিদাকে বড় কোনো পরিবর্তন হিসেবে ধরা যায় না।
Manual4 Ad Code
কৃষিতে সম্প্রসারণ অব্যাহত
Manual6 Ad Code
প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি কৃষিতেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) অনুযায়ী, অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে কৃষি খাতে সম্প্রসারণে রেকর্ড হয়েছে।
এমসিসিআই-পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) তথ্য বলছে, আগস্টে কৃষি খাতের পিএমআই ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫৬ দশমিক ৫-এ উন্নীত হয়েছে। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণের ধারায় ছিল। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানও বেড়েছে। উপকরণ ব্যয় শক্তিশালীভাবে বাড়তে থাকলেও বৃদ্ধির হার সামান্য কমেছে।
কৃষির এই ইতিবাচক ধারাকে অর্থনীতির অন্তর্নিহিত স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত বলে মনে করেছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ।
ট্র্যাকে ফিরছে রপ্তানি আয়
Manual1 Ad Code
গত অর্থবছরের বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করে রপ্তানি আয় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার)। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৯৭ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার (৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
রপ্তানি আয়ের মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ডলার। আগস্টে তা কমে ৩৬০ কোটি ৮৮ লাখ ৯০ হাজার ডলারে এবং সেপ্টেম্বরে ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়।
Manual7 Ad Code
একক মাস হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমলেও আগস্টে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে প্রথম প্রান্তিকের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতের রপ্তানি আয় বাড়ায় মোট রপ্তানি আয়ের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
রপ্তানির এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক বলে মনে করছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক নানা সংকট ও জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও দেশের অর্থনীতি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ইতিবাচক ধারা বজায় রাখা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।
তিনি বলেন, এই ইতিবাচক ধারাকে ধরে রাখতে বার্ষিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে প্রাথমিক লক্ষ্য রয়েছে, তা বজায় রাখার ওপর জোর দিতে হবে।
এখন পর্যন্ত মাসিক হিসাবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হলেও প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে এটি নিয়মিত বজায় রাখা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের অতীতের সেই ভয়াবহ দিনগুলো এখন না থাকলেও সামনের দিনগুলোতে এই ধারা টিকিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া সব ধরনের সহযোগিতা পেলে এই লক্ষ্য অর্জন আরও সহজ হবে। প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যা বা পরিমাণ বাড়ার বিষয়টিকে প্রাধান্য না দিয়ে লাভজনক ও টেকসই উপায়ে তা বাড়ছে কি না, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।