চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে হজযাত্রী পরিবহনের বিষয়টি চল্লিশ বছর পর আবারও আলোচনায়। সৌদি আরব সরকারের লিখিত অনুমোদন এবং জাহাজ ভাড়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হলে আগামী বছর আবার সমুদ্রপথে হজযাত্রী পরিবহন শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হজযাত্রী পরিবহনের সাথে যুক্তরা বলছেন, যেহেতু বিমানের চেয়ে জাহাজে যাতায়াতে বেশি সময় লাগবে তাই খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো গেলে আগ্রহী হবেন হাজযাত্রীরা।
এ বিষয়ে আগ্রহী চট্টগ্রামের একটি শিপিং কোম্পানি জাহাজে হজযাত্রী পরিবহনের জন্য ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি জাহাজ কিনতে চায়।
Manual6 Ad Code
Manual8 Ad Code
ওই জাহাজের এক যাত্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার যাত্রী হজে যেতে পারবেন বলে জানিয়েছে তারা। একবার যাওয়া আসায় সময় লাগবে অন্তত ১৬ দিন। কাজেই জাহাজে করে একাধিকবার যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে সময়, খরচ আর যাত্রীদের আগ্রহের ওপর।
সৌদি আরবের বরাদ্দ করা কোটা অনুযায়ী এবার বাংলাদেশ থেকে সোয়া এক লাখের বেশি মানুষ হজে যেতে পারবেন।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যাওয়ার জন্য দুটি প্যাকেজ রয়েছে। সাধারণ হজ প্যাকেজ-১-এর খরচ ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা, আর প্যাকেজ ২-এর জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮০ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সাধারণ প্যাকেজে এবার খরচ ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৩ হাজার ১৫৬ টাকা।
এখন কেবল সুদান থেকে জাহাজে করে হজযাত্রীরা সৌদি আরবে যান।
সরকারিভাবে বলা হয়েছে আকাশপথের চেয়ে সমুদ্রপথে যাতায়াত খরচ ৪০ শতাংশের মত কমবে, আবার শিপিং কোম্পানি বলেছে, সমুদ্রপথে গেলে খরচ কমতে পারে লাখ টাকার মত।
তাতে কি হজযাত্রীরা আগ্রহী হবেন? এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন, কারণ হজযাত্রীদের অনেকেই বয়স্ক। দীর্ঘ সময় সাগর যাত্রা তাদের জন্য কতটা সহনীয় হবে, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।
সমুদ্র পথে হজযাত্রা
বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে হজে যাবার ইতিহাস সুলতানি আমল থেকে, মূলত ওই সময় থেকেই বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়।
চট্টল তত্ত্ববিদ ও ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “সুলতানি আমলে (১৩৪০-১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলাদেশ তথা সমগ্র পূর্ব ভারতের হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ যোগে হজে যেতেন।” (পৃষ্ঠা ৫৫৭)।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে আরব সাগরের গালফ অব এডেন হয়ে জেদ্দা বন্দরের দূরত্ব প্রায় ৫ হাজার ৬৩৩ নটিক্যাল মাইল।
ব্রিটিশ আমলে কলকাতা ও বোম্বে বন্দর থেকে সমুদ্র পথে হজযাত্রা হলেও চট্টগ্রাম থেকে হজযাত্রা বন্ধ হয়ে যায়। পরে পাকিস্তান আমলে আবার জাহাজে হজযাত্রা শুরু হয়।
হজযাত্রী কল্যাণ সংস্থার চেয়ারম্যান এইচ এম মুজিবুল হক শুক্কুর বলেন, “পাকিস্তান আমলে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলিতে হাজী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। মূলত জাহাজে করে যারা হজে যেতেন তাদের জন্যই এই ক্যাম্পটি করা হয়েছিল। তখন আবার জাহাজে হজযাত্রা শুরু হযেছিল।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের হিজবুল বাহার নামের একটি জাহাজ হজযাত্রী পরিবহন করত। তখন আসা যাওয়ায় প্রায় দুই মাস লাগত। হজের জন্য মক্কা-মদিনায় অবস্থানের সময়সহ প্রায় তিন মাস লেগে যেত সেই যাত্রায়।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে প্রথম বিমানে হজযাত্রা শুরু হয়।
পাকিস্তান আমলে বিমানে করে হজযাত্রা উৎসাহিত করতে পত্রিকায় এরকম বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হত।
পাকিস্তান আমলে বিমানে করে হজযাত্রা উৎসাহিত করতে পত্রিকায় এরকম বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হত।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এর নির্বাহী কমিটির সদস্য এইচ এম মুজিবুল হক শুক্কুর বলেন, বিমানে ৬-৭ ঘণ্টায় সৌদি আরবে পৌঁছানো যেত। এরপর বিমানে হজযাত্রী পরিবহন বাড়তে থাকায় জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে একসময় চট্টগ্রামের হজ ক্যাম্পটিও বন্ধ হয়ে যায়।
“এরপর সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সাগর পথে জাহাজে করে হজযাত্রী পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি সফল হননি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন গত মাসে তার সৌদি আরব সফরে সেখানকার হজ ও ওমরাহ মন্ত্রী তাওফিক ফাউযান আল রাবিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওই বৈঠকে সমুদ্রপথে হজযাত্রী পাঠাতে বাংলাদেশের দেওয়া প্রস্তাবে সায় দেওয়ার কথা জানান সৌদি হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রী আল রাবিয়া।
সমুদ্র পথে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি চেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়েও আবেদন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ওই প্রস্তাবের বিষয়ে সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
Manual3 Ad Code
এরপর ওই প্রস্তাব নিয়ে আর তেমন আলোচনা ছিল না। সবশেষ ধর্ম উপদেষ্টার সৌদি আরব সফরের পর বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। সক্রিয় হয় কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডও।
কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশিদ বলেন, “ধর্ম উপদেষ্টা মহোদয়ের সফরের সময় সৌদি আরবের হজ বিষয়ক মন্ত্রী তাদের সম্মতির বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। এরপর আমাদের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে একটি ডিও লেটার সৌদি সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে। তাদের লিখিত সম্মতি পেলেই আমরা জাহাজের বিষয়ে অগ্রসর হব।”
কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের জেটি থেকেই হজযাত্রীদের জাহাজ চালানো সম্ভব বলে জানান কোম্পানির জনসংযোগ কর্মমকর্তা হাসানুর রহমান।
জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মতিউল ইসলাম বলেন, “সমুদ্র পথে হজযাত্রী পরিবহনে সৌদি আরব সম্মত আছে বলে বৈঠকে জানিয়েছে। জাহাজ সংগ্রহ হলে বাকি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
“একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হজযাত্রী পরিবহনে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। জাহাজের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে তারপর বন্দরের বিষয়ে আগানো হবে। কিছুটা সময় লাগবে। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।”
Manual5 Ad Code
খরচ কত কমবে
ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন গত ১১ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, সমুদ্রপথে জাহাজে হজযাত্রী পাঠানো গেলে খরচ ৪০ শতাংশ কম পড়বে।
সেদিন ধর্ম উপদেষ্টা বলেছিলেন, “জাহাজে হাজিদের পাঠানো হলে চার্টার শিপ ভাড়া করতে হবে। এটা করতে গেলে আমাদের দুই হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আমাদের কর্জ দেয়, তাহলে আমরা এটা করতে পারব। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুদান নয়, ঋণ নেওয়া হবে।
“সৌদি সরকার থেকে অনুমোদন পেলে সরকারের অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপ করে দুই হাজার কোটি টাকা যদি তারা ঋণ দেন, তাহলে হাজিদের নেওয়া হবে। একটা শিপিং কোম্পানি জানিয়েছে, তারা লাভের আশায় নয়, সওয়াবের আশায় এটা করবে। এটা করা হলে বিমানের থেকে ৪০ শতাংশ ভাড়া কম লাগবে জাহাজে।”
এবার বিমানে করে হজে যেতে খরচ হবে অন্তত পৌনে ৫ লাখ টাকা। জাহাজে গেলে যাতায়াত খরচ কিছু কমলেও অন্যান্য খরচ একই থাকবে।
এবার বিমানে করে হজে যেতে খরচ হবে অন্তত পৌনে ৫ লাখ টাকা। জাহাজে গেলে যাতায়াত খরচ কিছু কমলেও অন্যান্য খরচ একই থাকবে।
কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের এমডি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশিদ বলেন, “মূলত ধর্ম মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা করবে, আমরা ক্যারিয়ার। হজযাত্রী পরিবহনের জন্য ইউরোপ থেকে একটি ক্যারিবিয়ান ক্রুজ শিপ কিনতে চাই।
“সেটি আমরা দেখে রেখেছি। ৫০০ কোটি টাকার মত প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আমরা লোন চাইব। যদি কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়, তাহলে জাহাজটি কেনা সম্ভব হয়। এটা তো ব্যবসা না, ধর্মীয় কাজ।”
যে ক্রুজ শিপটি এই কাজে ব্যবহার করতে চান, সেটিতে তিন হাজার হজযাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে জানান আব্দুর রশিদ।
তিনি বলেন, “ওই জাহাজে করে আসা-যাওয়ায় ৮ দিন করে মোট ১৬ দিন সময় লাগবে। বিমানে যাতায়াতকারী প্যাকেজের চেয়ে জাহাজে গেলে জনপ্রতি খরচ এক লাখ টাকার মত কম পড়তে পারে।”
এর বাইরে হজের জন্য সৌদি আরবে অবস্থানসহ সব মিলিয়ে সমুদ্র পথে হজ যাত্রায় ৩০-৩২ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
হজযাত্রীরা কী ভাবছেন
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এস এম এনামুল ইসলাম তার বাবার জাহাজে করে হজযাত্রার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমার আব্বা আমিনুর রহমান মাস্টার ১৯৬৭ সালে ‘সাফিনা-ই-আরব’ জাহাজে করে হজে গিয়েছিলেন। তখন আগ্রহীদের মধ্যে থেকে হজযাত্রীদের বাছাই করতে চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে লটারি হত। লটারিতে আব্বার নাম উঠেছিল।
“শুরুতে হজযাত্রী হিসেবে রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটার বাড়ি থেকে তিনি পাহাড়তলি হাজী ক্যাম্পে আসেন। তখন সেটাই নিয়ম ছিল। সেখান থেকে অন্য হাজীদের সাথে আব্বাকেও চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর জেটিতে নেওয়া হয়। সেখানে থেকে জাহাজে ওঠেন তারা।”
জাহাজে করে সৌদি আরবে পৌঁছে সেখানে হজের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আবার জাহাজে চড়ে দেশে ফিরতে তিন মাস লেগেছিল জানিয়ে এস এনামুল ইসলাম বলেন, “আব্বা নিরাপদেই হজ সেরে ফিরেছিলেন। তখন জাহাজ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না হজে যাবার।
“পরে বিমান চালু হয়েছে। এখন তো মানুষ সবকিছু সংক্ষিপ্ত সময়ে করতে চায়। জাহাজে যাত্রায় সময় একটু বেশিই লাগবে। তবে যদি খরচ বিমানের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম হয়, জাহাজের ভালো মানের হয় এবং হাজীদের জন্য জাহাজে সব রকম সুব্যবস্থা থাকে তাহলে কেউ কেউ আগ্রহী হবেন। যেহেতু আমার আব্বা জাহাজে হজ করেছিলেন তাই সুযোগ হলে আমারও এভাবে হজে যাবার আগ্রহ আছে।”
চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট এলাকার বাসিন্দা কাজী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, “হজযাত্রীদের ইমিগ্রেশনের পুরো প্রক্রিয়াটি বিমানবন্দরে হয়। জাহাজে হজযাত্রীদের নেওয়া হলে ইমিগ্রেশন কোথায় কীভাবে হবে সেটা আগে ঠিক করতে হবে।
“বেশিরভাগ হজযাত্রী বয়স্ক। জাহাজে আসা-যাওয়া মিলে ১৬ দিন সময়ে তাদের স্বাস্থ্যগত বিষয় দেখার জন্য চিকিৎসকসহ সব ব্যবস্থা রাখা খুব জরুরি। অ্যারেঞ্জমেন্ট ভালো হবার পাশাপাশি খরচ কমলে অনেকে আগ্রহী হবেন।”
হজযাত্রী কল্যাণ সংস্থার চেয়ারম্যান এইচ এম মুজিবুল হক শুক্কুর বলেন, “৪০ বছর আগের বাস্তবতা আর এখনকার বাস্তবতা এক নয়, এটা বিবেচনায় রাখতে হবে। তখন হাজীর সংখ্যা ছিল কম এবং জাহাজ ছাড়া কোনো বিকল্প বাহনও ছিল না। এখন কেবল সুদান থেকে জাহাজে করে হজযাত্রীরা সৌদি আরবে যান।
“সৌদি সরকার যদি সম্মত হয়, তাহলে এই সেবা চালু করা যেতে পারে। তবে জাহাজ ভাড়া কত হবে সেটাই বিবেচ্য। কারণ সৌদি আরবে হজের অন্য খরচগুলো কোনোটাই কিন্তু কমবে না। বিমানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যে প্যাকেজ তার থেকে জাহাজের প্যাকেজের খরচ অন্তত এক থেকে দেড় লাখ টাকা কম হতে হবে। তা না হলে, এত দীর্ঘ সময় সাগর যাত্রা কেন করবেন বয়স্ক হজযাত্রীরা।”
পাশাপাশি চট্টগ্রামের হাজ ক্যাম্প পুনরায় চালু করা, হজযাত্রীদের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া কী হবে তা নির্ধারণ এবং সমুদ্রে যাত্রী পরিবহনে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।