আড্ডা, মাদক, দাপট: কিশোরদের টেনে নিচ্ছে যে অপরাধের জাল
আড্ডা, মাদক, দাপট: কিশোরদের টেনে নিচ্ছে যে অপরাধের জাল
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Manual8 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
স্কুলে যাওয়ার বয়সে কেউ হাতে তুলে নিচ্ছে চাপাতি, কেউ জড়াচ্ছে ছিনতাইয়ে। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার ভিডিও ছড়িয়ে ‘দাপট’ দেখাচ্ছে। টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতা, বড় ভাইদের অনুসরণ, মাদক, আড্ডা ও এলাকার আধিপত্য বিস্তারের মতো নানা প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিশোরদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর পরিণতিতে কেউ হচ্ছে অপরাধের শিকার, কেউ আবার নিজেই হয়ে উঠছে অপরাধী।
এরই মর্মান্তিক উদাহরণ কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে একজনের বয়স ১৫ বছর। পুলিশের দাবি, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তার ওপর হামলা করা হয়। পরে তাকে হত্যা করে মরদেহ নির্জন স্থানে ফেলে রাখা হয়। ঘটনাটি কিশোর বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও সামনে এনেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাতেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। রাজধানীর পল্লবীতে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক সাংবাদিকের বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনায় ওই গ্রুপের এক সদস্যকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কেরানীগঞ্জে মো. ফরহাদ হোসেন (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুলিশ বলেছে, তিনি মোহাম্মদপুর-রায়েরবাজার এলাকার কিশোর গ্যাং ‘পাটালী গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর যশোরে নারীদের হয়রানির প্রতিবাদ করায় এক তরুণীকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করার অভিযোগ ওঠে একদল তরুণের বিরুদ্ধে। জুলাইয়ে রাজশাহীতে এক রিকশাচালককে মারধর ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ছয়জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নওগাঁয় কিশোর গ্যাংয়ে যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় ভয় দেখিয়ে গুলি করার অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে।
এসব ঘটনার পর সন্তানদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে পড়ছেন অভিভাবকরা। সন্তান কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে কিংবা কী ধরনের পরিবেশে সময় কাটাচ্ছে; এসব বিষয়ে নজর রাখা অনেক পরিবারের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ছে।
‘আড্ডা’ থেকে অপরাধের দিকে
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা খেলাধুলা কিশোর বয়সের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব যখন এলাকার আধিপত্য, বড় ভাইয়ের নির্দেশ, মাদক, অস্ত্র কিংবা অপরাধী দলের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, মারামারি ও যৌন হয়রানির মতো অপরাধের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অপরাধের ভিডিও ধারণ করে টিকটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা কিশোরদের কাছে সহিংসতাকে ‘দাপট’ বা জনপ্রিয়তার উপকরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।’
Manual3 Ad Code
নজরদারির বাইরে মোবাইল
শিক্ষাবিদরা বলছেন, স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিজেই সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোন গ্রুপে যুক্ত হচ্ছে কিংবা অনলাইনে কী ধরনের আচরণ করছে; এসব বিষয়ে পরিবার অন্ধকারে থাকে।
Manual2 Ad Code
অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রতারণা, হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও নিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো ঘটনাতেও কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব শিশু কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। মাঠের কৃষকের বা রিকশাওয়ালার সন্তান নয়। আমাদের নতুন যে মধ্যবিত্ত সমাজ, তাদের অভিভাবকদের শুধু সচেতন করলেই হবে না, কাউন্সেলিংও দরকার। একটা সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। আমরা শুরু করবো, ভাবছি। তাদের বোঝাতে হবে, প্রযুক্তির যুগে সন্তানরা যেন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে, প্রযুক্তি যেন তাদের ব্যবহার করতে না পারে, যেন তাদের খেয়ে না ফেলে; সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’
শিশুরা ভিকটিম হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন যেটা হচ্ছে, তা একতরফা। একপেশেভাবে ওই বাচ্চাদেরই দোষ দেওয়া হচ্ছে। মোটরসাইকেলে ঘুরত, ইত্যাদি ইত্যাদি—ওটা তো কোনও অজুহাত হতে পারে না। বাচ্চাদের নয়, তাদের অভিভাবকদেরই আমাদের একটু কাউন্সেলিং করতে হবে। বোঝাতে হবে, এটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।’
Manual7 Ad Code
স্কুলের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের বিষয়ে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে যাচ্ছে কি না, পরীক্ষায় কত নম্বর পাচ্ছে, এসবের বাইরে তার আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে কি না, হঠাৎ নতুন বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে কি না, স্কুলে মারামারি বা ভয় দেখানোর ঘটনায় যুক্ত হচ্ছে কি না; এসব বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘অপ্রতিমের সহপাঠীরা তার জানাজায় অংশ নিয়েছে। সহপাঠীদের কাছে সে ছিল একজন স্কুলছাত্র, যে আর তাদের সঙ্গে ক্লাসে ফিরবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং, সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ কমে গেলে কিশোরদের অবসর সময়ের একটি বড় অংশ অনলাইন ও অনিয়ন্ত্রিত আড্ডায় চলে যেতে পারে। তাই শুধু শাস্তি নয়, ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে তাকে স্বাভাবিক সামাজিক ও শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও জরুরি।’
অসহায় অভিভাবক, দায় কার?
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সন্তানের হাতে দামি ফোন তুলে দেওয়া, নিয়মিত খরচ দেওয়া কিংবা স্কুলে পাঠানোর মধ্যেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কখন বাসায় ফেরে, হঠাৎ তার আচরণ বদলে যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখা প্রয়োজন। তবে নজরদারির অর্থ কেবল শাসন বা ফোন কেড়ে নেওয়া নয়। সন্তান যেন সমস্যায় পড়লে ভয় না পেয়ে বাবা-মাকে বলতে পারে, সেই সম্পর্কও তৈরি করতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তার আচরণে কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।’
Manual8 Ad Code
তিনি আরও বলেন, ‘বাবা-মায়ের সঙ্গে যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে, তেমনি ভালো সম্পর্ক থাকবে শিক্ষকদের সঙ্গেও। শিশুদের পড়াশোনার অগ্রগতি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠনে পরিবার এবং বিদ্যালয়; উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষকদের শিক্ষার্থীর আচরণগত পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে।’
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। কিন্তু শুধু সদস্য গ্রেফতার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিশোরটি কেন অপরাধে জড়াচ্ছে, কারা তাকে ব্যবহার করছে, মাদক বা অস্ত্র কোথা থেকে আসছে; এসব বিষয়ও অনুসন্ধান করতে হবে।’
কে এম এনামুল হক বলেন, ‘সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধী চক্রের পাশাপাশি কিশোরদের ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কাউন্সেলিং ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ বাড়াতে হবে। কিশোর বয়স ভবিষ্যৎ গড়ার সময়। সেই বয়সে একজনের হাতে বই, খেলাধুলার সরঞ্জাম ও সৃজনশীলতার সুযোগ থাকবে, নাকি অস্ত্র, মাদক ও অপরাধের হাতছানি; তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সমন্বিত নজরদারি এখনই জরুরি।’