সম্পর্কের বরফ গলছে, বিএনপির সঙ্গে বৈরিতা কাটিয়ে উঠছে ভারত
সম্পর্কের বরফ গলছে, বিএনপির সঙ্গে বৈরিতা কাটিয়ে উঠছে ভারত
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৭, ২০২৬, ০৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Manual3 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
গত ৩০ ডিসেম্বর মারা গেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসা আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও ছিলেন। পরদিন কালো পোশাকে শোকাহত পরিবেশে খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জয়শঙ্কর। দুজনের মুখেই ছিল গম্ভীরতা।
Manual2 Ad Code
সাক্ষাতে জয়শঙ্কর তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো একটি চিঠি তুলে দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বৈঠকের ছবি দিয়ে জয়শঙ্কর লেখেন, ‘ভারত সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানালাম। বেগম খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নে দিকনির্দেশনা দেবে—এমন আস্থা প্রকাশ করেছি।’
এই বক্তব্যকে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
দীর্ঘ সময় ধরে খালেদা জিয়ার ‘দর্শন ও মূল্যবোধ’-এর বিরোধিতা করে এসেছে নয়াদিল্লি। বাংলাদেশে তার সমর্থকদের কাছে তিনি ১৯৮০–এর দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হলেও, ভারতের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন সন্দেহের জায়গায়। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট, পাকিস্তানমুখী রাজনীতি এবং ভারতবিরোধী অভিযোগ—সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকেই তাদের স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে দেখেছে।
Manual1 Ad Code
তবে আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জয়শঙ্করের বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারত ও বিএনপি উভয়েই পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার পথে হাঁটছে।
তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আল জাজিরাকে বলেন, জয়শঙ্কর ও তারেক রহমানের ‘খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ’ বৈঠক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ‘নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা’ তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র–নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর থেকে বাংলাদেশের রাজপথে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব দেখা দেয়। শেখ হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। তাকে ফেরত না দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। উভয় দেশই সাময়িকভাবে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করেছিল।
Manual4 Ad Code
এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন সেই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে। দলটি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে; জামায়াত এখন ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া একটি দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। নির্বাচনের দৌড়ে বিএনপি ও জামায়াত–নেতৃত্বাধীন জোটকে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের জন্য জামায়াতের রাজনীতি ও পাকিস্তানঘনিষ্ঠ অবস্থান অগ্রহণযোগ্য হলেও, তারেক রহমান সাম্প্রতিক বক্তব্যে নয়াদিল্লির কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বার্তা দিয়েছেন।
১৭ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেছেন, তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চান, যেখানে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও ঢাকায় সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, নির্বাসনের সময় তারেক রহমান রাজনৈতিকভাবে ‘পরিণত’ হয়েছেন।
Manual3 Ad Code
২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে বাণিজ্য, সীমান্ত, নদীর পানি বণ্টন, নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুতে তীব্র উত্তেজনা ছিল। ভারত তখন অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আশ্রয় পাচ্ছে। ঢাকা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। শ্রিংলা বলেন, ঐ সময় পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শত্রুতাই ছিল সম্পর্কের পটভূমি।
তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময় মোদির শুভকামনা এবং বিএনপির কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে সম্পর্ক উষ্ণ করার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতের দৃষ্টিতে তারেক রহমান এখন ‘সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প’।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, অতীতের বোঝা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি বাস্তবতার কারণেই তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না—এমন সতর্কতাও রয়েছে। তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন শুরু করতে হলে অতীত থেকে ‘পরিষ্কার বিচ্ছেদ’ প্রয়োজন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নে ভবিষ্যৎ সরকারও ভারতের ওপর চাপ বজায় রাখবে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনে ভারতের বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে পাকিস্তানঘনিষ্ঠ বা ভারতবিরোধী তৎপরতা ঠেকানো। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। ‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল; এখন তা জনগণের সম্পর্ক হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে’—এমন বার্তাই দিচ্ছে তারেক রহমানের দল।