রেমিট্যান্স, শ্রমবাজার ও রপ্তানিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়ে অর্থবছর শুরু
রেমিট্যান্স, শ্রমবাজার ও রপ্তানিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়ে অর্থবছর শুরু
editor
প্রকাশিত আগস্ট ৪, ২০২৬, ০১:১০ অপরাহ্ণ
Manual5 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
Manual4 Ad Code
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান প্রধান খাতে গতি ফিরে আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নীতিগত সহায়তায় নতুন অর্থবছরের শুরুতেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম ভিত্তি রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা জুলাইয়েও অব্যাহত আছে। ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি চমৎকার সূচনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ২৮৫ কোটি ৯০ লাখ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
Manual8 Ad Code
আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সে হিসাবে বছরের ব্যবধানে জুলাই মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রবাসী আয় সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকগুলোর এই সক্রিয়তার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, আমদানি-সংক্রান্ত দায় পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান তারা যেন নিজেদের সংগৃহীত রেমিট্যান্স থেকেই করতে পারে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে ডলারের জন্য বারবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হবে না, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাশা করছে, অর্থবছরজুড়ে রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সরকার ব্যাংক বা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দিচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আগ্রহ বেড়েছে। তাছাড়া হুন্ডির কুফল সম্পর্কে প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সরাসরি প্রভাব ফেলবে এবং রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।
গত ২ আগস্ট দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গড় রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ-এর নির্দেশিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে এই রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে যুদ্ধের ক্ষত সেরে উঠছে
Manual2 Ad Code
প্রবাসী আয় দেশে পাঠানো ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ বিদেশ গমন পরিস্থিতিও আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৭১ হাজার ৮৪ জন কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে যান। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে কাজের জন্য ৭৯ হাজার ৪৫৩ জন বিদেশে গিয়েছিলেন। আর গত জুনে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছিল ৫১ হাজার ৩০৫ জন। সে হিসাবে জুলাইয়ে জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
Manual4 Ad Code
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে কাজের সন্ধানে বিদেশে যাওয়ার মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারির ২৮ দিনে যেখানে বিদেশে গিয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৬৩৪ জন, যুদ্ধ শুরু হলে মার্চে তা নেমে আসে ৪৪ হাজার ৬৫৮ জনে। আর এপ্রিলে সেই সংখ্যা হয় ৪৮ হাজার ৮৫৯ জন। এরপর নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে তা খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
রপ্তানি আয়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান খাত তৈরি পোশাক। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ ভাগই তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আসে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের সংকোচন হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে যেখানে প্রতি মাসে তৈরি পোশাকে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, গত অর্থবছরজুড়ে সেখানে আগের রপ্তানি আয় ধরে রাখা যায়নি, ক্রমাগত কমেছে। সেখানে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানি আয় ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও নেতারা বলছেন, দেশে গ্যাসসংকটের মধ্যে পড়লেও তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়া গেছে। চলতি বছরজুড়ে তার ফল পাওয়া যাবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে আগের মাসের (জুন) তুলনায় রপ্তানি আয় কিছুটা বেড়েছে; তবে আগের অর্থবছরের জুলাই মাসের চেয়ে রপ্তানির পরিমাণ এখনো কিছুটা কম।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারে—যা আগের মাস জুনের ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ডলারের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের ৩৯৬ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের রপ্তানি আয়ের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম।
যা বলছেন উদ্যোক্তারা
জুলাই মাসের এই রপ্তানি চিত্র ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি বেশ ভালো একটি খবর। অনেক দিন পর এত বড় অঙ্কের রপ্তানি দেখা গেল। আমরা এখন যে ধরনের প্রতিকূলতা বা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তার মধ্যেও এমন একটি অর্জন অবশ্যই ইতিবাচক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো ফলাফল আরও ভালো হতে পারত।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় রপ্তানি কিছুটা কম—এটিকে শুধু নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই; কারণ আবার গত মাসের চেয়ে যে অনেকটা বেড়েছে, সেটিও তো সত্য। ফলে এই সামান্য ওঠানামা বা ১৯-২০ তো থাকবেই। তবে মোটের ওপর এটি গত বছরের মতোই একটি ভালো অগ্রগতি। গত বছর বা এই বছর যাই হোক না কেন, রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার হওয়া মানে এটি অত্যন্ত ভালো একটি অবস্থান।’
রপ্তানি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে জানান মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ (শুল্ক) কার্যকর হওয়ার আগেই হয়তো কিছু অতিরিক্ত পণ্য বা শিপমেন্ট চলে গেছে। এছাড়া মাঝে কিছু অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ছিল; ঈদের ছুটির কারণে যে সময়ের ব্যবধান তৈরি হয়েছিল, সেটির কারণে পণ্যের যে স্টক জমেছিল, তার একটি চাপ বা তাগিদও হয়তো এখানে ভূমিকা রেখেছে। আর বছরের এই সময়টাতে আমাদের রপ্তানি কিছুটা বেশিই হয়ে থাকে।’
নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে আসার পর দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি পোশাক খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার ফলে সেই অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) থেকে সোমবার সন্ধ্যায় জানানো হয়, চলতি বছরের জুলাইয়ের রপ্তানি আয়ের এ ধারা পোশাক খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ার মূল কারণ হলো—২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্ক কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে জুলাই মাসে ক্রেতারা বেশি বেশি পোশাক ডেলিভারি নিয়েছেন। ফলে জুলাই মাসের রপ্তানি আয়ের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় ফেরার ইঙ্গিত দেয়।