স্টাফ রিপোর্টার:
সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপি ও দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেত্রীরা। সরকারি দল বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। সে অনুযায়ী আসন অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মধ্যে দলটি পাবে ৩৫টি। এসব আসনের বিপরীতে দলটির শতাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একটি সংরক্ষিত নারী আসন পেতে ছয়জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য থাকা প্রয়োজন। সেই হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ৩৫টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ১১টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১টি আসন পাবে। বাকি ৩টি আসন নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা জোট করলে এবং নিজস্ব প্রতীকে জয়ী দলগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতা পৌঁছলে তারা পাবেন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়ে গেছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো যাদের মনোনীত করবেন, মূলত তারাই নির্বাচিত হবেন। দলগুলো ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কমিশন সেই সময়ের মধ্যেই তা সম্পন্ন করবে।
Manual8 Ad Code
বিএনপি নেতারা বলছেন, আগামী সংসদে সংরক্ষিত আসনে কারা দলীয় মনোনয়ন পাবেন কিংবা কোন যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে– এসব নিয়ে এখনো দলে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে, যোগ্যপ্রার্থী হয়েও সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন এমন নারী নেত্রীরা স্বাভাবিকভাবে প্রাধান্য পাবেন। পাশাপাশি বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা মহিলা দল, ছাত্রদলের সাবেক-বর্তমান নেত্রীরা মনোনয়ন পাবেন। এ ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের স্ত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন বলে দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
সংরক্ষিত আসন নিয়ে দলে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির নারী নেত্রীরা থেমে নেই। যে যার মতো করে দলের স্থায়ী কমিটির নেতাসহ দলের প্রভাবশালীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লবিং করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ বিগত দিনের রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছেন।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার আলোচনায় আছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল) বিলকিস আকতার জাহান শিরিন, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপির পরাজিত প্রার্থী মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, শাম্মী আখতার, মহিলা দলের ঢাকা দক্ষিণের আহ্বায়ক রুমা আক্তার, মহিলা দলের সহ-সভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য জেবা আমিনা খান, সাবেক সংরক্ষিত সংসদ সদস্য নাভীলা চৌধুরী, রেহানা আক্তার রানু, বদরুন্নেসা সরকারি কলেজ ছাত্র দলের প্রথম ভিপি বেগম খায়রুন নাহার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, প্রয়াত বিএনপি নেতা নাছির উদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা, জাসাস কেন্দ্রীয় নেত্রী ও অভিনেত্রী শায়লা ইসলাম, ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকতারা আক্তার উর্মি, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আনোয়ারা শিখা, স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক শাহিনুর বেগম সাগর, সাবরিনা বিনতে আহমেদ, মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভর সম্পাদক আসমা আজিজ, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আয়শা সিদ্দিকা মানি, চিকিৎসক ডা. ইলমা মোস্তফা ও মহিলা দলের নেত্রী সাবিনা খান পপি।
বিএনপির সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বড় ছেলে ড. খন্দকার আকবর হোসেন বাবলুর সহধর্মিণী খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়াও সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হতে পারেন বলে দলের একটি সূত্রে জানা গেছে।
মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ বলেন, আমি তো মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু দল থেকে দেয়নি। দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি। ৯৬’ সাল থেকে বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। বেগম খালেদা জিয়া, দলের আনুগত্যে থেকেছি। একাধিকবার কারাগারে ছিলাম। রিমান্ডে নির্যাতনে হাত-পা প্যারালাইসড হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আশা করি দল এখন সংরক্ষিত আসনে আমাকে মনোনয়ন দেবে।
ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন বলেন, বিগত ১৭ বছর মাঠের রাজনীতিতে সম্মুখসারিতে ছিলাম। দলের দুঃসময়ে সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছি। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই। আমি আশা করি দল ত্যাগীদের মূল্যায়ন করলে আমাকেও মূল্যায়ন করবে।
নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন বলেন, ২০১৫ সাল থেকে আমার সংগঠনের ব্যানারে দেশের মানুষের জন্য এবং দলের গুম, খুনের শিকার যারা হয়েছেন তাদের আইনি সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সহযোগিতাও করেছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে তারুণ্যের রাষ্ট্র চিন্তার সংলাপগুলো শুরু করেছি।
বীথিকা বিনতে হোসাইনকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় নিয়মিত অংশ নিতেও দেখা গেছে।
Manual6 Ad Code
সাবেক সংরক্ষিত সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, আমি আগেও দুইবার সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য ছিলাম। এবারও প্রত্যাশা করি দল আমাকে রাখবে।
Manual1 Ad Code
ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, ১/১১ সরকারের সময় থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছি। আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে একটানা ৬ মাস কারাগারে ছিলাম। ৫টি মামলার আসামি হয়েছি। আমি আশা করি দল ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে। যেহেতু আমি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম, সেই হিসাবে আমাকে মূল্যায়ন করবে বলে প্রত্যাশা করি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন পাব বলে আশা করি।
Manual4 Ad Code
দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের মধ্যে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমদ ও দলের আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী রুমানা মাহমুদও সংরক্ষিত আসনের আলোচনায় আছেন। এদের মধ্যে আফরোজা আব্বাস ছাড়া অন্য দুইজন আগে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন।
তবে বিএনপির একটি সূত্র বলছে, এবার এক পরিবার থেকে দুইজনকে সংসদ সদস্য না করার সিদ্ধান্ত আছে দলের। এটি বাস্তবায়ন করা হলেও স্থায়ী কমিটির এই তিন সদস্যের পরিবারের কেউ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন না।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিরিন সুলতানা, নিলুফার চৌধুরী মনি, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেত্রী অপর্ণা রায়, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, রুখসানা খানম মিতু, আয়েশা সিদ্দিকা, নেওয়াজ হালিমা, ফরিদা ইয়াসমীন, হেলেন জেরিন, আইনজীবী শাকিলা ফারজানা, চট্টগ্রাম মহিলা দলের মনোয়ারা বেগম মনির নামও আলোচনায় আছে।