টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার দাপনাজোর এলাকায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তর দিয়ে রিসোর্ট ও স্পা সেন্টারে যাতায়াতকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই গেট ও রাস্তা ব্যবহার করছে স্কুলের কিশোরী ছাত্রীরা এবং রিসোর্টে আসা নারী-পুরুষ। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত মার্থা লিডস্ট্রিম নূরজাহান বালিকা উচ্চবিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এলাকার কন্যাশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। শুরুতে বিদ্যালয়ে দাপনাজোর ও আশপাশের গ্রামের চার শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করলেও এখন তা কমে নেমে এসেছে ৮০ জনে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি একসময় শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশের জন্য সুপরিচিত ছিল।
Manual8 Ad Code
তবে ২০২০ সালে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের উদ্যোগেই স্কুলসংলগ্ন বিস্তীর্ণ জায়গায় প্রথমে চালু করা হয় ওয়াটার গার্ডেন রিসোর্ট। পরে চালু হয় স্পা সেন্টার। এটির বর্তমান মালিক বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান হাবিব মনসুর।
অভিযোগ উঠেছে, রিসোর্ট নির্মাণের সময় পৃথক প্রবেশপথ বা সীমানা প্রাচীরের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে একই গেট ব্যবহার করছে স্কুলছাত্রী ও রিসোর্টের অতিথিরা। এতে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে এক ধরনের মিশ্র পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা।
Manual8 Ad Code
২০২২ সালে জেলা শিক্ষা অফিস থেকে তৎকালীন শিক্ষা অফিসার লায়লা খানম ১৫ দিনের মধ্যে আলাদা গেট নির্মাণ করার জন্য নির্দেশনা দিলেও তা অমান্য করে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া এ বিষয়ে এলাকাবাসী রিট করলে হাইকোর্ট থেকেও ২০২৪ সালের ১৪ মে আলাদা গেট করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সাবেক গভর্নর আহসান হাবিব মনসুর হাইকোর্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনো আলাদা গেট করেননি।
অন্যদিকে রিসোর্টের ভেতরে মাসে এক দিন স্পেশাল অফারের মাধ্যমে নারীদের দিয়ে নৃত্য পরিবেশনা ও বিদেশি মদের আসর জমিয়ে কনসার্টের আয়োজন করা হয়। যার টিকিটের বুকিং দাম ধরা হয় ৩ হাজার টাকা। থার্টি ফার্স্ট নাইটে কনসার্ট করা হয়। সে সময় একদম খোলামেলাভাবে মদ পান করতে দেখা যায় লোকজনকে।
৩০৬.৫ শতাংশ জমি জুড়ে বিদ্যালয়টি স্থাপিত হলেও এখন প্রায় ১০০ শতাংশ জমি রিসোর্টের দখলে চলে গেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বাসভবন থাকলেও তা এখন রিসোর্টের কাজে ব্যবহার হয় বলেও জানান কিছু শিক্ষক।
রিসোর্ট প্রতিষ্ঠার সময় একজন সদস্য বলেছিলেন, ‘আমাদের গভর্নর বলেছেন যে প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা অবসর সময় কাটাবেন এই রিসোর্টে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্পা সেন্টার চালু করা হয়েছে। এরপর এই স্পা সেন্টার বন্ধ করার জন্য এলাকাবাসী দাবি জানালে তারা মালিকদের শত্রুতে পরিণত হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী বলেন, ‘একটি বালিকা বিদ্যালয়ের পাশে স্পা সেন্টার পরিচালনা সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। একই গেট ব্যবহার করায় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
Manual2 Ad Code
একজন অভিভাবক বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের মেয়েরা নিশ্চিন্তে স্কুলে যাতায়াত করুক। কিন্তু রিসোর্টের অতিথিদের সঙ্গে একই প্রবেশপথ ব্যবহার হওয়ায় আমরা দুশ্চিন্তায় থাকি।’
Manual5 Ad Code
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা মন্তব্য করেন, এটি পরিকল্পনার ঘাটতি। শুরুতেই আলাদা গেট করলে এত বিতর্ক হতো না। এখন বিষয়টি পুরো এলাকার সম্মান ও শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে এই কারণে যে, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্তদের একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান হাবিব মনসুর। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এমন একজন ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কেন অবকাঠামোগত এই সংবেদনশীল বিষয়টি আগে থেকে গুরুত্ব পায়নি? যদিও এ বিষয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের কয়েকবারের সভাপতিও তিনি। সভাপতি থাকার সময় বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি কাজের জন্য ৩ লাখ টাকা সরকারিভাবে বরাদ্দ করা হলেও তা দিয়ে রিসোর্টের বাউন্ডারি কাজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী পরিদর্শন করে কাজ দেখতে না পেয়ে বিল বন্ধ করলে টিন দিয়ে তাড়াহুড়া করে এক রাতের মধ্যে কাজ দেখিয়ে বিল তুলে নেন এই আহসান হাবিব মনসুর।
এক শিক্ষক বলেন, ‘একই গেট ব্যবহার হওয়ায় আমরা বিব্রত ও উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য দ্রুত পৃথক বাউন্ডারি ওয়াল ও গেট নির্মাণ প্রয়োজন।’
অন্যদিকে রিসোর্টের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার জানিয়েছেন, মালিকপক্ষ দেশে ফিরলে পৃথক প্রবেশপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগেও নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।’
এ ঘটনায় এলাকায় একদিকে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা বিতর্ক নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই পরিস্থিতির সমাধান হোক।