প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এফডিআই স্টকের (এখন পর্যন্ত মোট যত বিদেশি বিনিয়োগ আছে) দিক থেকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ এগিয়ে।
হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ১৩ গুণ, ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ১৭ গুণ ও কম্বোডিয়ার প্রায় তিনগুণ বেশি। এফডিআই স্টক কম হওয়ার কারণ হলো, বাংলাদেশে এফডিআইয়ের প্রবাহও কম। নানা কারণে বাংলাদেশ এই দেশগুলোর তুলনায় এতটা পিছিয়ে আছে।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ ভবনে আঙ্কটাড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেনটেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠান হয়। প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।
২০২৪ সালে যেখানে বাংলাদেশের এফডিআই স্টক ছিল ১ হাজার ৮২৯ দশমিক ৪ কোটি ডলার। একই সময় ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ছিল ২৪ হাজার ৯১৪ দশমিক ১ কোটি ডলার, কম্বোডিয়ার ছিল ৫ হাজার ২৬৬ দশমিক ৭ কোটি ডলার ও ইন্দোনেশিয়ার ৩০ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৬ কোটি ডলার।
বাংলাদেশে কমার কারণ : অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ২০১৩ সালে এফডিআইয়ের যে অবস্থা ছিল, সেখান থেকে আমরা খুব বেশি এগোতে পারিনি। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার একই রয়ে গেছে; বরং কিছুটা কমে গেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়াতে আমরা কাজ করছি, কিন্তু তা থেকে তেমন কোনো ফল আসছে না।
Manual7 Ad Code
আশিক চৌধুরী আরও বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে অনেক পরিকল্পনা করা হয়, অনেক সুন্দর সুন্দর প্রতিবেদন বের হয়, সেই প্রতিবেদনের সঙ্গে আমরা একমতও পোষণ করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না। এই অবস্থা পরিবর্তনে গতি পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন আশিক চৌধুরী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছিল ১৮০ কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। ফলে কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর সময়ের তুলনায়ও এফডিআইয়ের প্রবাহ কমে যায়। তবে এ সময়ে দেশে এফডিআই স্টক মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল প্রায় ১৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
Manual2 Ad Code
এ সময় বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক কারণ ছিল। ২০২১ সাল থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৩৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আমদানি বিল পরিশোধে বিলম্ব সৃষ্টি করে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা ও বিলম্ব শিল্প খাতের সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। ফলে বিনিয়োগকারীদের পরিচালন ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়।
পাশাপাশি ২০২৩-২৪ সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও পরিবর্তন আসে। একই সময়ে দেশের বৃহত্তম রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়।
Manual1 Ad Code
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের কারণেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। এসব কারণে সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
Manual6 Ad Code
তবে ২০২৫ সালের প্রাথমিক সূচকে কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের মাধ্যমে এফডিআইয়ের প্রবাহ আবার বাড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমছে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেদনে আইএমএফকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে ফিরলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশের সূত্র ধরে আশিক চৌধুরী আরও বলেন, বাংলাদেশের এখন সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের সময় এসেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য হবে উদ্দেশ্যনির্ভর পরিকল্পনা, শক্তিশালী বাস্তবায়ন ও সমন্বিত উদ্যোগ। গত পাঁচ বছরে যে অগ্রগতি হয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরে একই মাত্রার পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
করণীয় কি : ইউএনডিপি বাংলাদেশের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি সোনালি দায়ারত্নে তিনটি করণীয়ের কথা জানান। তিনি বলেন, প্রথমত বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নের জন্য সংস্কারের ইচ্ছার জায়গা থেকে সংস্কার বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছতা, পূর্বাভাস করতে পারার সুযোগ ও আস্থা প্রয়োজন। তাদের জানতে হবে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারের সব প্রতিষ্ঠান একে অন্যের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের জন্য সংস্কার মানে কেবল আইন, নীতি বা প্রণোদনা নয়, বরং সংস্কারের পরিকল্পনা, সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত বিনিয়োগ নীতি অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিনিয়োগ কেবল বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করার বিষয় নয়।