বন্ধ কারখানা চালু হচ্ছে: অর্থনীতিতে নতুন গতি ফেরানোর চেষ্টা
বন্ধ কারখানা চালু হচ্ছে: অর্থনীতিতে নতুন গতি ফেরানোর চেষ্টা
editor
প্রকাশিত মে ৪, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
Manual2 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটিয়ে প্রবৃদ্ধির চাকা আবার সচল করতে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক বক্তব্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত— সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকায় ‘বন্ধ কারখানা চালু’ এখন শুধু অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি কৌশলগত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে আসছেন। বিভিন্ন বৈঠক, নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন— অচল শিল্প ইউনিটগুলো সচল না করা গেলে অর্থনীতিতে টেকসই গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তার এই অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও একই ধরনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ
বন্ধ কল-কারখানা সচল করে কর্মসংস্থান বাড়াতে কম সুদে ঋণ সুবিধা দিতে একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের চিন্তা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই তহবিল সরকারের অর্থায়নে হবে, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে— তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে।
সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ১৮ মাসে এককোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু তহবিল সহায়তা নয়, বন্ধ কারখানাগুলো কীভাবে দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়— সেই লক্ষ্যে আরও নানা ধরনের নীতি সহায়তার বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
Manual5 Ad Code
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের নেতৃত্বে গঠিত ১৯ সদস্যের কমিটি এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে। কমিটিতে নির্বাহী পরিচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামতও নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব ও সম্ভাব্য সুবিধা
ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিল করা। কারখানা চালুর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা। আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সহজ করতে ব্যাংকিং সুবিধা বৃদ্ধি। কম মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া।
তবে এসব প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, যেকোনও সুবিধা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কারখানার আর্থিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। বিশেষ করে জালিয়াতি বা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সুবিধার বাইরে রাখা হবে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং একে স্বাগত জানান। তার মতে, এসব কারখানা আগে থেকেই চালু থাকলে অর্থনীতিতে আরও গতি সঞ্চার হতো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেত এবং জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তো।
তিনি আরও বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করলে দ্বিমুখী সুবিধা পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদনে ফেরা যায়। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক কম ব্যয়ে এসব কারখানা সচল করা সম্ভব। এর বিপরীতে নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে জায়গা নির্বাচন, উচ্চ ব্যয় এবং উৎপাদনে যেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়।
মহিউদ্দিন রুবেলের ভাষায়, সরকার যদি কার্যকরভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে অর্থনীতিতে স্থবির হয়ে থাকা অর্থ পুনরায় গতিশীল হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আইএমএফের শর্ত ও নীতিগত দ্বিধা
পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত। সংস্থাটির চলমান ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত হলো—নতুন করে বড় ধরনের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল তৈরি না করা।
আইএমএফের যুক্তি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি অর্থায়ন মানে বাজারে নতুন তারল্য সৃষ্টি, যা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। তারা এটিকে “কোয়াজি ফিসক্যাল অ্যাক্টিভিটি” হিসেবে বিবেচনা করে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় তহবিল সংকুচিত করেছে। যেমন— রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ২.২০ বিলিয়ন ডলারে আনা হয়েছে।
সিএমএসএমই খাতের বিশেষ তহবিল ২৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন তহবিল গঠন না করে বিকল্প পদ্ধতিতে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা: কর্মসংস্থানে জোর
সর্বশেষ মহান মে দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অতীতে পরিকল্পিতভাবে দেশের শিল্প খাত দুর্বল করা হয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে।
Manual4 Ad Code
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা গেলে বেকার হয়ে পড়া শ্রমিকদের পুনরায় কাজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
আশার আলো ও সতর্ক সংকেত
তৈরি পোশাক খাতে পরিস্থিতি এখনও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। শিল্প মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। যদিও একই সময়ে প্রায় ৩৫০টি নতুন কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, শিল্প খাত একদিকে সংকুচিত হলেও অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগও আসছে— যা একটি মিশ্র বাস্তবতা নির্দেশ করে।
কেন বন্ধ হয়েছিল কারখানাগুলো
Manual2 Ad Code
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একাধিক কারণে শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো— ব্যাংক ঋণের অভাব ও উচ্চ সুদের হার। নীতিগত অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক লেনদেন সংকট, বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা এবং ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও আস্থার সংকট।
অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেয়ে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার কেউ কেউ বাজার সংকট ও রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার কারণে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেননি।
Manual4 Ad Code
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন ভূমিকা
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে— বন্ধ কারখানার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন। ঋণ পুনঃতফসিল সহজ করা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ইউনিট পর্যবেক্ষণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শিল্প খাতে দ্রুত গতি ফিরে আসতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে শিগগিরই একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, উৎপাদনমুখী কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে গত দেড় বছরে বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা প্রদান এবং ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদারের নির্দেশনা দেন গভর্নর।
নতুন সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে কয়েকটি কৌশল গ্রহণ করেছে— বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন, শিল্প খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: চাপ ও বাস্তবতা
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা শিল্প খাতে চাপ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। আর সেই কারণেই বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু হলে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সেগুলো হলো— হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ফিরে আসবে। উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ কমবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু স্বল্পমেয়াদি সমাধান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পখাতকে শক্তিশালী করার একটি কার্যকর কৌশল।