প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

লালনপালনের ১৫ বছর পর মেয়েকে অস্বীকার চিকিৎসক মায়ের

editor
প্রকাশিত জুন ৬, ২০২৬, ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
লালনপালনের ১৫ বছর পর মেয়েকে অস্বীকার চিকিৎসক মায়ের

Manual7 Ad Code

 

রাজশাহী প্রতিনিধি:

জন্ম নিবন্ধনে মা হিসেবে যার নাম, সমাজে পরিচয়ও যার মেয়ে হিসেবে। কোলে-পিঠে করে বড় করেছেন, নাম লিখিয়েছেন নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, দিয়েছেন নিজের পরিবারের পরিচয়। কিন্তু ১৫ বছর পর সেই নারীই জানালেন—‘সে আমার মেয়ে নয়’। এরপর শুরু হয় এক কিশোরীর পরিচয় বদলের প্রক্রিয়া। বদলে যায় জন্ম নিবন্ধন, সংশোধন হয় শিক্ষাগত নথি, প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ।

Manual3 Ad Code

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর আলোচিত এই ঘটনার পেছনে রয়েছে দত্তক গ্রহণ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, উত্তরাধিকার সম্পত্তি এবং আইনি জটিলতার এক বিস্ময়কর গল্প, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল (১৮) নামের এক তরুণীর পরিচয়ের লড়াই।

 

২০০৮ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিল কার্যালয়ে একটি শিশুর জন্ম নিবন্ধন করা হয়। সেই নিবন্ধনে শিশুটির নাম লেখা হয় ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল। মা হিসেবে উল্লেখ করা হয় রাজশাহীর প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শিপ্রা চৌধুরীর নাম এবং বাবা হিসেবে লেখা হয় তার স্বামী ডা. ওবায়দুর রহমানের নাম।

এরপর থেকে পায়েলের পরিচয় ছিল একেবারেই স্পষ্ট। তিনি ডা. শিপ্রা চৌধুরীর মেয়ে হিসেবেই পরিচিত ছিলেন পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে। রাজশাহীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা, অভিজাত পরিবেশে বেড়ে ওঠা, চিকিৎসক মায়ের সঙ্গে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ— সব মিলিয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মতোই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর।

 

কিন্তু ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে এসে সেই পরিচয়ের ভিত্তিটাই যেন ভেঙে পড়ে। পারিবারিক বিভিন্ন টানাপোড়েনের এক পর্যায়ে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর আচরণে পরিবর্তন আসে বলে দাবি করেন পায়েল। একসময় তাকে জানানো হয়, তিনি আসলে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর গর্ভজাত সন্তান নন। বরং তিনি একজন পালিত সন্তান। শুধু তাই নয়, তাকে আরও বলা হয়, তার প্রকৃত বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় এবং তার আসল বাবা একজন রাজমিস্ত্রি।

হঠাৎ করেই এমন কথা শুনে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্নের মুখে পড়েন পায়েল। তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে উনাদের কাছেই বড় হয়েছি। পরিবারের সদস্য বলতে তারাই ছিল আমার সবকিছু। বাবা আলাদা থাকতেন, ভাইও দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মা। কিন্তু একসময় তার আচরণ বদলে যেতে থাকে। পরে তিনি আমাকে বলেন, আমি তার নিজের মেয়ে নই, আমি পালিত সন্তান। কথাগুলো শুনে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম। কারণ এতদিন যে পরিচয়ে বড় হয়েছি, সেটাই যদি সত্য না হয় তাহলে আমি আসলে কে?’

পায়েলের দাবি, ‘মৌখিকভাবে সম্পর্ক অস্বীকার করার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। এরপর তার জন্ম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নথিপত্রে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালে তার জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধন করা হয়। পাশাপাশি একাডেমিক কাগজপত্রেও পরিবর্তন আনা হয়। এমনকি ২০১০ সালে নিজের মেয়ে পরিচয়ে পায়েলের নামে যে জমি দান করা হয়েছিল, সেটি ফেরত চেয়েও মামলা করা হয়।’

 

 

পায়েল বলেন, ‘সবচেয়ে অবাক লাগে, যেসব নথি তারাই তৈরি করেছিলেন, সেগুলো কীভাবে পরিবর্তন করা হলো আমি জানি না। আমার এনআইডি কার্ডে এক তথ্য, জন্ম নিবন্ধনে আরেক তথ্য, শিক্ষাগত কাগজপত্রে আবার ভিন্ন তথ্য। এসব কারণে বিভিন্ন জায়গায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়ও জটিলতা তৈরি হয়েছিল। আমার পড়াশোনার এক বছর নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো নানা জায়গায় পরিচয় প্রমাণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ি।’

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০২৩ সালের জানুয়ারির দিকে ডা. শিপ্রা চৌধুরী তাদের অফিসে এসে দাবি করেন, ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল তার নিজের সন্তান নন। তখন তারা জানতে চান, যদি সন্তান না হন তাহলে জন্ম নিবন্ধনের সময় কেন মা হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন?

 

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে বলেছিলাম, আপনি যদি এখন বলেন মেয়েটি আপনার সন্তান নয়, তাহলে আগে যে তথ্য দিয়েছেন সেটি তো বিভ্রান্তিকর। বিষয়টি আমাদের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শিপ্রা চৌধুরী সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি।

Manual1 Ad Code

তবে তার পুত্রবধূ শাম্মী এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আবেগের বশে এবং কাউকে না জানিয়ে শাশুড়ি পায়েলকে নিজের মেয়ে পরিচয়ে জন্ম নিবন্ধন করিয়েছিলেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন যে এটি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হয়নি। দত্তক গ্রহণের কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রও ছিল না। জন্ম নিবন্ধনে আমার শ্বশুরের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল অথচ তিনি বিষয়টি জানতেন না। পরে ভুল বুঝতে পেরে শাশুড়ি নথিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেন।’

Manual5 Ad Code

 

এদিকে গোপন সূত্রে জানা যায়, ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল একটি ছেলেকে ভালোবাসেন। তবে সেই ছেলেকে পছন্দ নয় ডা. শিপ্রা চৌধুরীর। এই জন্যই তিনি পায়েলের আসল পরিচয় বলে দেন।

ঘটনার আরেকটি নাটকীয় দিক সামনে আসে নতুন জন্ম নিবন্ধনে যুক্ত হওয়া মা-বাবার বক্তব্যে। সংশোধিত নিবন্ধনে পায়েলের বাবা-মা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাবুল মিয়া ও টগরী বেগমের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তবে টগরী বেগম দাবি করেন, পায়েল তাদের জৈবিক সন্তান নন।

 

তিনি বলেন, ‘এটি সত্য নয়। এলাকার মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই বিষয়টি জানতে পারবেন। আমাদের নাম কীভাবে ব্যবহার করা হলো সেটিও প্রশ্নের বিষয়।’

অন্যদিকে বাবুল মিয়ার বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় ডা. শিপ্রা চৌধুরী আমার মেয়েকে নিয়ে যান। তখন বলা হয়েছিল ভবিষ্যতে যেন আমার কোনো দাবি না থাকে। একটি কাগজে স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল মেয়েটি তাদের পরিচয়েই বড় হবে। এখন এত বছর পর কেন তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে, সেটি আমি বুঝতে পারছি না।’

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমানও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি ছোটবেলায় ডা. ম্যাডাম এসে বাচ্চাটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন বাবুলের পরিবারকে বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে বাচ্চার ওপর কোনো দাবি করা যাবে না। এমনকি দেখতে যেতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। এখন হঠাৎ করে পরিচয় অস্বীকার করার কারণ আমাদের কাছেও পরিষ্কার নয়।’

 

মোবারকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক হায়দারী বলেন, আমাদের কাছ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র নেওয়া হয়েছিল। সেটি পরে কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে আমরা নিশ্চিত নই। তবে শুনেছি ওই নথির ভিত্তিতেই জন্ম নিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে। আমার জানামতে শিশুটিকে অনেকটা স্থায়ীভাবেই অন্য পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে রাজশাহীর সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জমসেদ আলী বলেন, ‘যদি প্রমাণিত হয় পায়েল ডা. শিপ্রা চৌধুরীর ঔরসজাত সন্তান নন, তাহলে তিনি উত্তরাধিকার আইনে ওয়ারিশ হবেন না। তবে দীর্ঘদিন একটি পরিচয়ে বড় করার পর সেই পরিচয় অস্বীকার করে তার ক্ষতি করা হলে ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ থাকতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় মেয়েটি আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।’

অনুসন্ধানে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই পরিচয় পরিবর্তনের পেছনে উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কেউই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে নারাজ।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code