দেশে বর্তমানে নিবন্ধন পাওয়া (চার চাকা বা তার বেশি) যানবাহন রয়েছে প্রায় ১৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ছয় লাখের ফিটনেস সনদ নেই।
শতাংশের হিসাবে প্রতি তিনটি যানবাহনের মধ্যে একটির নেই ফিটনেস সনদ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, সড়ক-মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচল করলেও তদারকি ও কার্যকর আইন প্রয়োগের অভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৭ লাখ যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৬ হাজার বাস ও মিনিবাস, দুই লাখ ২০ হাজার ট্রাক, কার্গো ভ্যান ও ট্যাংকার এবং প্রায় দুই লাখ ৯৪ হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে।
Manual6 Ad Code
ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি পুলিশকে চিঠি দিয়েছে বিআরটিএ। সংস্থাটির মুখপাত্র ও পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘১৭ লাখ চার চাকার যানবাহনের মধ্যে প্রায় ছয় লাখের ফিটনেস নেই। আমরা পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছি। এসব যানবাহন সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অ্যাডমিন) হাবিবুর রহমান খান বলেন, ‘ছয় লাখ গাড়ির ফিটনেস নেই বলে বিআরটিএ আমাদের তথ্য দিয়েছে। তবে আমরা মহাসড়কভিত্তিক কাজ করি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা আঞ্চলিক সড়ক ও নগরের অভ্যন্তরে বেশি। মহাসড়কে তুলনামূলক কম।’
কিন্তু মহাসড়কে চলাচলকারী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের বড় একটি অংশের তো ফিটনেস নেই, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক।
তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া আমরা চলন্ত গাড়ি থামাই না। এ জন্য কিছু গাড়ি ফাঁকি দিয়ে চলে যায়। তার পরও এসব যানবাহন শনাক্তে আমরা আরো সতর্ক হব।’
সড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি : সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও চালকদের দক্ষতার ঘাটতি।’
Manual3 Ad Code
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবছর দেশে হাজারো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় বা আহত হয়। এর বড় কারণ যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং চালকদের অদক্ষতা। ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।’
Manual5 Ad Code
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বেশির ভাগ বাসের অত্যন্ত নাজুক অবস্থা। অনেক বাসের রং উঠে গেছে, জানালা ও আসন ভাঙা, বাম্পার ক্ষতিগ্রস্ত। আবার অনেক যানবাহনের ব্রেক, স্টিয়ারিং, হেডলাইট ও সিগন্যাল লাইটে ত্রুটি রয়েছে। এসব বাস থেকে নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে অনেক সময় মাঝপথে বাস বিকল হয়ে যানজট তৈরি করছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আসিফ রায়হান বলেন, ‘দেশে সড়ক দুর্ঘটনার কত শতাংশ ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কারণে ঘটছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। কারণ বেশির ভাগ দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারিগরি তদন্ত করা হয় না। আইন অনুযায়ী দুর্ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে অতিরিক্ত গতি বা বেপরোয়া চালানোর মতো সাধারণ কারণ উল্লেখ করা হয়। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটি, ব্রেক বিকল, স্টিয়ারিং সমস্যা বা ফিটনেসজনিত ত্রুটি কতটা ভূমিকা রাখছে, তা জানা যায় না।’
আসছে বাধ্যতামূলক স্ক্র্যাপিং : ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরাতে সরকার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। এই নীতিমালার লক্ষ্য হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং দীর্ঘদিন ফিটনেসবিহীন থাকা যানবাহন পরিবেশবান্ধব উপায়ে স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং করা।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ফিটনেসবিহীন থাকা যানবাহন, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, মারাত্মক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন, অনুমোদনহীনভাবে পরিবর্তিত যানবাহন এবং নির্ধারিত দূষণমাত্রা বারবার অতিক্রমকারী যানবাহন স্ক্র্যাপযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
শুধু বিআরটিএ অনুমোদিত স্ক্র্যাপ ভেন্ডরের মাধ্যমে এসব যানবাহন ধ্বংস করা যাবে। স্ক্র্যাপের পর নিবন্ধন বাতিল করা হবে এবং মালিককে ‘সার্টিফিকেট অব ভেহিকল স্ক্র্যাপিং’ দেওয়া হবে। সরকার চাইলে এই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে নতুন যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা বা আর্থিক প্রণোদনাও দিতে পারবে।
নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো, মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো মোটরযান স্ক্র্যাপ না করে একই মালিক নতুন বা পুরনো কোনো মোটরযানের নিবন্ধন নিতে পারবেন না।
Manual1 Ad Code
মোটরযান স্ক্র্যাপ নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার জন্য বিআরটিএ অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।