প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে ঝুঁকিতে কোটি প্রাণ

editor
প্রকাশিত জুলাই ১৫, ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে ঝুঁকিতে কোটি প্রাণ

Manual3 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

দেশের বাজারে নীরবে বিস্তার ঘটছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বাণিজ্য। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের ফার্মেসি, ওষুধের গুদাম, এমনকি কিছু হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারেও মিলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ।

গত ছয় মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত অভিযানে নিয়মিতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধ উদ্ধার, জরিমানা ও মামলা হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, বিচ্ছিন্ন অনিয়মের গণ্ডি পেরিয়ে সমস্যাটি এখন সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে এ ধরনের ওষুধের ধারাবাহিক উপস্থিতি তদারকি ও ওষুধ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। আইনে কঠোরতা থাকলেও প্রয়োগে শিথিলতায় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিস্তার ঘটছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ‘ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উৎপাদন, বিক্রি বা প্রদর্শন করলে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে।

তবে ভেজাল ওষুধ বিক্রি ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এই আইনের প্রয়োগ কম।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে ঝুঁকিতে কোটি প্রাণতদারকির ঘাটতি, অবিক্রীত ওষুধ ফেরত নেওয়ার অকার্যকর ব্যবস্থা এবং দায়িত্বে অবহেলার সুযোগে গড়ে উঠেছে এই অবৈধ সরবরাহচক্র। এর ফলে প্রতিদিনই অজান্তে রোগীর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ।

অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভের কাছে প্রতিনিয়ত বলি হচ্ছে জনস্বাস্থ্য। ওষুধ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে সাধারণ রোগীরা প্রতারিত হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে হাজারো মানুষ।
ক্ষতিকর দিক ও আইনি কাঠামো : মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শুধু কার্যকারিতা হারায় না, বরং ক্ষতিকর উপাদান তৈরি করে রোগীর শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এ ধরনের ওষুধ সেবনে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, অঙ্গহানি, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে দুটি শিশুর মৃত্যু : ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর সবুজবাগে ১৬ মাস বয়সী শিশু নাদিয়া খাতুন বমির জন্য স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়ানোর পর অসুস্থ হয়ে পড়ে।

হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। পরিবার দেখে, তাকে দেওয়া ভিটামিন সিরাপের মেয়াদ ২০২৩ সালেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ঘটনার পর ফার্মেসির মালিক ও কর্মচারীরা পালিয়ে যান।
একই বছরের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত চার বছর বয়সী শিশু আয়েশা মণিকে স্থানীয় এক কথিত চিকিৎসক ‘আপেলিন’ নামের আয়ুর্বেদিক সিরাপ দেন। ওষুধ সেবনের পরপরই শিশুটির মৃত্যু হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেন, সিরাপটি সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। অভিযোগে মামলা করেছে তার বাবা। এ ঘটনায় ফার্মেসি মালিক মোস্তাকিম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এই দুই নির্মম ঘটনা প্রমাণ করে, তদারকির অভাব ও অসাধু ব্যবসায়ীদের অবহেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কিভাবে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে বিধায় এই অপরাধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান মোবাইল কোর্টগুলো গুরুতর এই অপরাধে ১০ বছরের কারাদণ্ডের পরিবর্তে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে অপরাধীদের ছেড়ে দিচ্ছেন। জনস্বাস্থ্যের এই চরম বিপর্যয় রুখতে হলে অপরাধীদের আর্থিক জরিমানা নয়, বরং বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনেই নিয়মিত আদালতে সোপর্দ করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।’

কারা জড়িত : অসাধু ব্যবসায়ী, কিছু কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি, অসাধু ফার্মেসি মালিকদের একটি অংশ এই কাজে জড়িত। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করছে, কিন্তু জনবলসংকট ও রাজনৈতিক প্রভাবে কার্যকারিতা কম। ডিজিডিএ বলছে, নমুনা পরীক্ষা ও অভিযান অব্যাহত; কিন্তু বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারক কম্পানির এক টেরিটরি সুপারভাইজার বলেন, ‘আমাদের কম্পানির কোনো ওষুধের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগেই আমরা ফার্মেসিগুলোকে তা বিক্রি করতে নিষেধ করি। আমাদের মাঠ পর্যায়ের সহকর্মীদের নির্দিষ্ট করে ফার্মেসি ভাগ করে দেওয়া আছে, তাঁরা নিয়মিত সেসব দোকান থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদ ফুরিয়ে আসা ওষুধগুলো সংগ্রহ করে নেন। এমনকি যে দামে (টিপি রেট) ফার্মেসিগুলো ওষুধ কেনে, ঠিক সেই দামেই আমরা তা ফেরত নিই। কিন্তু কোনো ফার্মেসি মালিক যদি বাড়তি মুনাফার লোভে ওষুধ ফেরত না দিয়ে গোপনে সাধারণ ক্রেতার কাছে তা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে (এমআরপি) বিক্রি করে দেয়, তবে কম্পানির পক্ষ থেকে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতাদের সততা ও তদারকি সবচেয়ে বেশি জরুরি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের জন্য মূলত অসাধু ফার্মেসি মালিকরাই দায়ী। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ফার্মেসির লাইসেন্স দিলেও তা নিয়মিত তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও লোকবল তাদের নেই। এখন দেশের পাড়া-মহল্লায় ও রাস্তার মোড়ে মোড়ে ওষুধের দোকান গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। ফলে ফার্মেসিগুলোর ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ছোট ভেন্ডর, অন্য দোকান কিংবা অপ্রচলিত ও অবৈধ উৎস থেকে যারা ওষুধ কেনে, তাদের ক্ষেত্রেই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ ছাড়া অনিবন্ধিত কিছু ফার্মেসিও এ ধরনের অপরাধে জড়িত। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোগ সারানোর বদলে উল্টো শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে।’

ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ : মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধের সমস্যা রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি প্রকট হলেও এর বিস্তার এখন সারা দেশে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অপরাধের তুলনায় শাস্তি কম হওয়ায় এই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের কারবার থামছে না।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা গ্যাস্ট্রিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের নমুনার প্রায় ১০ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, জাপানের কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটি এবং জার্মানির এবেরহার্ড কার্ল ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে রাজধানীর বেশির ভাগ ফার্মেসিতেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

Manual5 Ad Code

খুলনায় হেরাজ মার্কেটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নকল, অনুমোদনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের একটি সরবরাহচক্র, যেখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এসব ওষুধ ছড়িয়ে পড়ছে। জেলা ঔষধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুলনায় ২৪টি মামলা করে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক খান মাহাতাব আহমেদ বলেন, ‘যেসব ওষুধ ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ বিক্রি করবে সে দায়ভার সমিতি নেবে না। সবাইকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে ব্যবসা করতে হবে। এ জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে যেকোনো সহযোগিতা তাঁরা দেবেন।’

চট্টগ্রামে গত চার মাসে ১০০টি ওষুধের দোকানে অভিযান চালিয়ে ৯৫টি দোকানকে ১০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা, ২২টি দোকান সিলগালা এবং তিনজন ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মো. ফখরুজ্জামান বলেছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান আরো জোরদার করা হবে।

রাজশাহী, ফেনী, মুন্সীগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও পিরোজপুর জেলায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যানেসথেসিয়া ইনজেকশন, কোথাও ফিজিশিয়ান স্যাম্পল ও অনুমোদনহীন ওষুধ, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মজুদ পাওয়া গেছে।

Manual2 Ad Code

পাবনায় গত মে ও জুন মাসেই এ ধরনের অপরাধে ২৯টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে দুজনের কারাদণ্ড হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ১৮টি ওষুধের দোকানকে তিন লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জে একটি ফার্মেসির প্রায় ৩০ শতাংশ ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।

Manual2 Ad Code

এদিকে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) সূত্র জানিয়েছে, তাদের গুদামে সংরক্ষিত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ৩০ কোটি টাকারও বেশি পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খুচরা ফার্মেসি থেকে শুরু করে সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের এই চিত্র দেশের ওষুধ ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দায় আছে ওষুধ কম্পানির : নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কমপক্ষে তিন মাস আগে দোকানি কম্পানিকে জানালে কম্পানি ওষুধ ফেরত নিয়ে সমপরিমাণ নতুন ওষুধ দিয়ে থাকে। কম্পানি গড়িমসি করলে দোকানি ঔষধ প্রশাসনকে জানাবেন, তখন প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কোনো অবস্থায়ই দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখা যাবে না। তবু যদি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থাকে, তাহলে তা ইচ্ছাকৃত অন্যায় মুনাফারই ইঙ্গিত।

২ লাখ ৩৫ হাজার ফার্মেসি, তদারকির সক্ষমতা নেই : সাধারণত ফার্মেসির নিবন্ধন দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গত বছরের ডিসেম্বরে সংস্থাটি প্রকাশিত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে এখন মোট ফার্মেসির সংখ্যা দুই লাখ ৩৫ হাজার ৫২১। শুধু গত বছরের জুন পর্যন্ত ৯৪ হাজার ৭৭৭টি ফার্মেসিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে নিবন্ধন ছাড়াই ৫০ হাজারের বেশি ফার্মেসি আছে। যদিও এই ফার্মেসিগুলোর বিরুদ্ধে এখনো বড় কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে।

জানা গেছে, গত এক বছরে সংস্থাটি ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখার অভিযোগে আড়াই হাজারের বেশি মামলা করেছে। জরিমানা হিসেবে আদায় করা হয়েছে এক কোটি ১৩ লাখ টাকা। বাতিল করা হয় সাতটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন।

Manual1 Ad Code

কী করছে ঔষধ প্রশাসন : মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মার্কেট সার্ভেইল্যান্স ও কন্ট্রোল বিভাগ নিয়মিত বাজার তদারকি করছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দৈনিক প্রতিবেদন অনলাইনে প্রেরণ করেন এবং মহাপরিচালক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তা মনিটর করেন। মাসিক সমন্বয় সভায় কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও পুরস্কৃত করা হয়।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। যারাই অপরাধ করুক, ছাড় দেওয়া হবে না।’ তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নির্দিষ্ট স্থানে রাখার নিয়ম থাকলেও তা বিক্রি করা নিষিদ্ধ।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সদ্যোবিদায়ি মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘আমি দায়িত্বে থাকাকালীন দেশের নামি-দামি ও বড় বড় ফার্মেসিতেও প্রচুর মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পেয়েছি। অনেক ফার্মেসি এসব মেয়াদ পার হওয়া ওষুধ আলাদা করে রাখার ন্যূনতম প্রয়োজনও বোধ করেনি, সাধারণ ওষুধের সঙ্গেই শেলফে সাজিয়ে রেখেছিল। আমাদের অভিযানে এমন অসংখ্য মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অহরহ জরিমানা করা হচ্ছে।’

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, ‘ওষুধের বিক্রয় প্রতিনিধি থেকে শুরু করে ফার্মেসি মালিক—সবাই নিজেদের কমিশন ও মুনাফা ঠিকই পেয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যত বিপদ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু সাধারণ ভোক্তার। অসাধু ব্যবসায়ীরা যা করছেন, তা অত্যন্ত গর্হিত এবং স্পষ্ট আইনবিরোধী কাজ।’

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিস্তার রোধে করণীয় : খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের এই ভয়াবহ চক্র বন্ধে প্রথমেই প্রয়োজন কার্যকর তদারকি ও আন্ত সংস্থা সমন্বয়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবলসংকট মোকাবেলায় দ্রুত পদায়ন ও নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র‌্যাব, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে এবং লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। প্রতিটি ওষুধের প্যাকেটে কিউআর কোড ব্যবহার করে সংরক্ষণাগার, ব্যাচ নম্বর ও মেয়াদের তারিখের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইসে সংরক্ষণ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘ওষুধ কম্পানিগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফেরত নিয়ে ধ্বংস করতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে কার্যকর মনিটরিং সিস্টেম চালু করতে হবে। প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের এই মহাচক্র বন্ধ করা সম্ভব।’

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমান ভোক্তা অধিকার আইনে এই পুরো খাতের অনিয়ম শক্তভাবে কাভার করার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চিকিৎসা খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বাঁচাতে এবং সাধারণ মানুষের পকেট ও জীবন রক্ষা করতে সরকারি সংস্থাগুলোর ভেতরে যেমন জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি পুরো ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তির চাদরে ঢেকে ফেলা এখন সময়ের দাবি।’

রাজশাহী ঔষধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, ‘রোগীদের সচেতন হতে হবে বেশি। ওষুধ কেনার সময় মেয়াদ ও প্যাকেটের বিবরণ দেখতে হবে, লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনা বন্ধ করতে হবে। তাহলেই ওষুধ নিয়ে অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হবে।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code