প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২রা সফর, ১৪৪৮ হিজরি

শেখ হাসিনার ফেরার বার্তা: বিচার, নাকি ঢাকা-দিল্লির নতুন সমীকরণ?

editor
প্রকাশিত জুলাই ১৫, ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ণ
শেখ হাসিনার ফেরার বার্তা: বিচার, নাকি ঢাকা-দিল্লির নতুন সমীকরণ?

Manual7 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা, ফাইল ছবি
ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গন, কূটনৈতিক মহল ও প্রশাসনিক পর্যায়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।

সরকার বলছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশে ফিরলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে।

 

Manual2 Ad Code

অন্যদিকে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা মনে করছেন, বিষয়টি শুধু বিচার বা রাজনীতির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কূটনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে।

 

Manual5 Ad Code

 

 

প্রায় দুই বছর ধরে ভারত সরকারের আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনা এর আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক বক্তব্য রেখেছেন। তবে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সময় উল্লেখ করে দেওয়া এই বক্তব্যই প্রথমবারের মতো তার দেশে ফেরা নিয়ে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে।

ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং কূটনৈতিক আলোচনা চলমান থাকলেও এবার তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

 

গত সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

 

তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা ভারত বা বাংলাদেশে যেখানেই আত্মসমর্পণ করুন না কেন, তাকে আগে কারাগারে যেতে হবে। বিদেশে বসে কোনো দণ্ডিত ব্যক্তি কী বক্তব্য দিচ্ছেন, তা সরকার আমলে নেয় না।’

সরকারের এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয় প্রতিক্রিয়ার পর্ব।

 

ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। তবে তার আগমনকে কেন্দ্র করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বিএনপি তা প্রতিহত করবে।

 

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনা মূলত রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। সৎ সাহস থাকলে ডিসেম্বরের অপেক্ষা না করে আজই দেশে ফিরে এসে বিচার মোকাবিলা করুক তিনি।’

‘গত দুই বছরে আওয়ামী লীগ তাদের মনোবল হারানো কর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। দেশে ফেরার আলোচনার উদ্দেশ্য বিচার মোকাবিলা নয়; বরং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা। তবে জনগণ তা হতে দেবে না।’ বলছিলেন সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।

 

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার অপরাধের বিষয়ে আদালতই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি দেশে ফিরবেন কি না, কিংবা আওয়ামী লীগের নেতারা কী করবেন, সেটি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার জনগণ চায় এবং সেই বিচার আদালতে চলছে। সরকার বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না; আদালত স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

 

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘ডিসেম্বরে কেন, আগামীকালই তো তিনি (শেখ হাসিনা) দেশে আসতে পারেন। একজন অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা সবচেয়ে ভালো। তিনি বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন, সে হিসেবে সামনাসামনি দেখাই ভালো।’

Manual5 Ad Code

শামসুজ্জামান দুদু আরও বলেন, শেখ হাসিনা একজন রাজনৈতিক অপরাধী। তিনি খুনি ও লুটেরা হিসেবে চিহ্নিত। তার বিরুদ্ধে একাধিক নয়, শত শত হত্যা মামলা রয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিচার হওয়াটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে ভারতের ভূমিকা থাকতে পারে। গত দুই বছরে তার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে আছে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিস্থিতি, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে তৈরি হওয়া শীতলতার প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণার পেছনে ভারতের ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।

 

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দলীয়ভাবে এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব বক্তব্য দেবেন। তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, সে অনুযায়ী আমরা তাকে ফেরত চাই। আমরা চাই তিনি দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হোন। আইনমন্ত্রীও বলেছেন, তিনি যেহেতু দণ্ডপ্রাপ্ত, তাই দেশে ফিরলে আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। তিনি ফিরলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। আপিলের কোনো সুযোগ থাকলে সেটি আইন-আদালত নির্ধারণ করবে।

রয়টার্সকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের পর বিষয়টি আর কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারের প্রত্যর্পণ উদ্যোগ, বিএনপির প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা—সব মিলিয়ে এটি এখন বিচার, কূটনীতি ও রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

 

সরকার প্রত্যর্পণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। বিএনপিও বলছে, দেশে ফিরলে বিচার এড়ানোর সুযোগ নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতা, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত।

 

মঙ্গলবার ভারতের নয়াদিল্লিতে আয়োজিত দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে উঠে আসে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরা প্রসঙ্গ।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি। যে কোনো প্রত্যাবাসন ইস্যু আইনগত ব্যাপার। এটা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে মঙ্গলবার তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা নিয়ে সরকার বিষয়টাকে কীভাবে দেখছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‌‘উনার আসার ব্যাপারে আমরা যেহেতু চেষ্টা করছি, তাই উনি যদি আসেন, আমরা তাকে স্বাগত জানাবো। আমরা জাস্টিস নিশ্চিত করতে চাই।’

Manual4 Ad Code

 

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার শুরু থেকেই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের চেষ্টা করছে এবং ভারতের কাছেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা জিওপলিটিক্যালি কোনো ইস্যু বলে আমি মনে করি না। আমাদের এ বিষয়ে কোনো চাপ বা কোনো প্রবলেম আছে বলেও মনে করি না। এই সরকারও ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে, সুতরাং যেটা বলা যায় আসলে চাপের কিছু নেই। উনি এলে কীভাবে আসবেন প্রসেসটা ঠিক হয়ে যাবে। আমি জানি না উনি কীভাবে কী করবেন। উনি ওখানে কীভাবে আছেন এগুলো ওই রাষ্ট্র জানেন, উনি যদি আসতে চান ওই রাষ্ট্র আমাদের রাষ্ট্রের সাথে কথাবার্তা বলে ব্যবস্থা করবেন। ওটা প্রসেস প্রসিটিউরাল ব্যাপার, আটকে থাকবে না।’

শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরবেন কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে থাকবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code