৬ সদস্যের পরিবার চালাতে গ্যারেজে কাজ করে ৮ বছরের শিশু
৬ সদস্যের পরিবার চালাতে গ্যারেজে কাজ করে ৮ বছরের শিশু
editor
প্রকাশিত আগস্ট ৮, ২০২৬, ০১:৪৬ অপরাহ্ণ
Manual8 Ad Code
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
একটি পরিবারের ৬ জনের সংসারের ভরণ পোষণের ভরসা এখন ৮ বছরের এক বাচ্চার কাঁধে। কথাটি শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই নির্মম বাস্তব। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত নাগদহ গ্রামে একটি ভাঙাচোরা ঘরে বাস করেন সুশান্ত কুমার সরকারের পরিবার। দরিদ্রতা এই পরিবারটিকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। ৬ জনের পরিবারের মধ্যে সুশান্তসহ তার আরও দুটি সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী।
Manual4 Ad Code
প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় সুশান্ত কুমার পার্শ্ববর্তী চিলমারী উপজেলায় একটি রুটি কারখানায় কাজ করছেন। কিন্তু কারখানায় কাজ করতে যে শারীরিক শক্তি ও পরিশ্রম করতে হয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তার হাত ও পায়ের জটিলতার কারণে অন্যদের মতো কাজ করতে না পারায় কাজটি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পরে তার পারিবারিক দুরবস্থার কথা চিন্তা করে কারখানার অন্যান্য সহকর্মীদের অনুরোধে সামান্য বেতনে তাকে বহাল রাখেন রুটি কারখানার মালিক। সেই অর্থে নিজেই চলতে পারেন না সুশান্ত। ফলে তার স্ত্রী শিখা রানী বিভিন্ন বাড়িতে টুকটাক কাজ করে যে একসের-আধসের চাল পান, তাই ফুটিয়ে সন্তানদের মুখে আহার তুলে দেন।
Manual1 Ad Code
এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে চলা এই পরিবারের সবচেয়ে বড় সন্তান ৮ বছরের হ্নদয় চন্দ্র সরকার। যে বয়সে তার বই, খাতা, স্কুল ব্যাগ নিয়ে রঙিন শৈশব কাটানোর কথা, সেই বয়সে কঠিন বাস্তবতা তাকে সময়ের আগেই বড় করে দিয়েছে। আজ সে শুধু শিশু নয়, পরিবারের একমাত্র ভরসা। উলিপুর শহরে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ করে সে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর যে আয় করে সেটাই ৬ জনের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। কখনও খাবার জোটে কখনও বা জোটে না। খেয়ে না খেয়েই চলছে এই পরিবারের সংগ্রামী জীবন।
ছোট্ট শিশু হ্নদয় জানায়, আমার পরিবারের জন্য আমি এই দোকানে কাজটি করছি। আমার বাবা পঙ্গু, আমার ভাই পঙ্গু। এজন্য আমি পরিবারের জন্য এই কাজ করছি।
Manual8 Ad Code
Manual2 Ad Code
মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক আশরাফুল ইসলাম জানান, এই ছেলের পরিবার গরিব, বাবা প্রতিবন্ধী। পরিবারের ৪ জনের মধ্যে সে বড়। আমার এখানে কাজ করে যে দু’চার পয়সা আয় করে, তাই দিয়ে সংসার চালায় সে।
আক্ষেপ করে হ্নদয়ের বাবা সুশান্ত কুমার সরকার বলেন, আর দশটা মানুষ যে কাজ করতে পারে, আমি সেই কাজ করতে পারি না। আমার বাবা-মা নেই। চারটি সন্তানের মধ্যে দুটি সন্তান আমার মত পঙ্গু হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ৮ বছরের বড় ছেলেকে মোটরসাইকেল গ্যারেজে দিয়েছি।
হ্নদয়ের মা শিখা রানী জানান, বাড়িতে অভাব লেগে আছে। যা জোগাড় করি অনেক সময় নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাওয়াই। সন্তানেরা ভালোমন্দ খাইতে চায়, দিতে পারি না। তখন বুকটা ফেটে যায়।
প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আমার বাড়ির পাশে সুশান্তের বাড়ি। খুবই অভাবী সংসার তার। আমি তার কষ্ট লাঘবে যে ফ্যাক্টরিতে কাজ করি, সেখানে তাকে কাজ জুটিয়ে দিয়েছি। প্রতি শুক্রবার আমি তাকে আমার মোটরসাইকেলে পার্শ্ববর্তী চিলমারী উপজেলায় কাজে নিয়ে যাই এবং বুধবার সন্ধ্যায় বাড়িতে পৌঁছে দেই। সে ৬ দিন ফ্যাক্টরিতে টুকটাক কাজ করে।
প্রতিবেশী অরবিন্দ রায় বলেন, এটি একটি দুস্থ পরিবার। প্রতিবেশীরাও অভাবগ্রস্ত। ফলে তাদেরকে সহযোগিতা করার কেউ নেই। দেশের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে পরিবারটি স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে।
এ ব্যাপারে গুনাইগাছ ইউনিয়নের ৭নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সোলায়মান আলী জানান, ওদের পরিবারের মধ্যে ৩ জন প্রতিবন্ধী। বর্তমানে এই বাচ্চাটা সংসার চালায়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতটুকু পারি আমি সহযোগিতা করি। যদি কোনো বিত্তবান টাকা পয়সাওয়ালা লোক পাশে দাঁড়ায় তাহলে সংসারটি ভালো চলবে।
উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, ওই পরিবারের যে দুইজন প্রতিবন্ধী রয়েছেন, আমাদের কাছে আবেদন করলে প্রতিবন্ধী ভাতা করে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ. টি. এম. আরিফ জানান, প্রতিবন্ধী ভাতা যেন তারা পায় সে ব্যবস্থা করা হবে।