৩৪ বছর ধরে নিজ উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে গ্রামের চিত্র বদলে দিলেন ইমাম
৩৪ বছর ধরে নিজ উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে গ্রামের চিত্র বদলে দিলেন ইমাম
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ণ
Manual6 Ad Code
ভোলা প্রতিনিধি:
Manual3 Ad Code
বলা হয় মানুষ বিচিত্রময়। বিচিত্রময় তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড। এমনই এক ব্যক্তির ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ডের খোঁজ মিলল ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায়। আগামী প্রজন্মের জন্য বিশুদ্ধ বাতাস ও আল্লাহকে রাজিখুশি করতে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে বছরের পর বছর ধরে নিজ উদ্যোগে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি স্থাপনের মধ্যদিয়ে সরকারি রাস্তার পাশে বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও ওষুধিসহ নানা ধরনের গাছের চারা লাগিয়ে যাচ্ছেন একজন মসজিদের ইমাম। ইতোমধ্যে তিনি বদলে দিয়েছেন একটি গ্রামের সড়কের দুই পাশের চিত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রেজাউল কিবরিয়া বাবুল (৬০)। পেশায় তিনি স্থানীয় জনতা বাজার-সংলগ্ন কালাপানিয়া বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম, এই মসজিদেই দুই যুগ ধরে ইমামতি করছেন তিনি। সেখানকার সম্ভ্রান্ত মাস্টার তোফায়েল আহমেদ সেক্রেটারির আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিন চার নম্বর। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে রয়েছে।
জানা গেছে, রেজাউল কিবরিয়া বাবুল উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছ লাগানোর মাধ্যমে একদিকে সড়কটিকে দিয়েছেন যেমন এক ভিন্ন রূপ। অন্যদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ করছে পথচারী থেকে শুরু করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষকেও। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এভাবেই নিজ উদ্যোগে এই সড়কের দুই পাশে তালগাছ লাগিয়েছেন মসজিদের ইমাম রেজাউল কিবরিয়া বাবুল হুজুর। গাছ লাগানো চালিয়ে যাচ্ছেন গ্রামটির আরও চারটি সড়কের দুই পাশে।
Manual7 Ad Code
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুধু তালগাছ নয়, বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছও লাগিয়ে চলেছেন তিনি। বছরের পর বছর পরিচর্যা ও যত্নে তার লাগানো গাছগুলো এখন বড় হয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে সবুজের ছায়া, নির্মল বাতাস। সেইসঙ্গে বজ্রপাত থেকে মানুষের প্রাণ রক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ঢাল হয়ে। একসময় সাধারণ একটি গ্রামীণ সড়ক থাকলেও বর্তমানে সারি সারি তালগাছের কারণে বদলে গেছে এর চিত্র। গাছের ছায়ায় স্বস্তি পাচ্ছেন পথচারী ও কৃষকরা। উপকৃত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।
Manual2 Ad Code
এ ছাড়া তালগাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পাশাপাশি তালপাতা ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন কাজে। গাছের কাঁচা ও পাকা-সুমিষ্ট ঘ্রাণের তালও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বাড়তি আনন্দ যোগ করে। ফলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এসব গাছ রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এখন এই সড়কটি স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আকৃষ্ট করছে দূর-দূরান্তের মানুষকে। সারি সারি তালগাছের সৌন্দর্য দেখতে অনেকেই ছুটে আসছেন এখানে। কেউ গাছের কোমল ছায়ায় বসে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ আপনজনদের সঙ্গে আড্ডা ও স্মৃতিচারণ করছেন। আবার অনেকেই মনোরম পরিবেশের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিয়ে যাচ্ছেন স্মৃতি হিসেবে।
রেজাউল কিবরিয়া বাবুল হুজুর বলেন, মূলত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং ইহকাল ও পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশেই আমি প্রায় তিন যুগ ধরে ইমামতির পাশাপাশি রাস্তার পাশে নানা ধরনের বৃক্ষরোপণ করে আসছি। শুরুটা করেছি ১৯৯৩-৯৪ সালে ৮ লাখ টাকায় পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে স্থানীয় ভূইয়ারহাটে গাছের নার্সারি স্থাপনের মধ্য দিয়ে। সে সময়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষকে বিভিন্ন গাছের চারা দিয়েছি এবং গাছ লাগানোর জন্য উদ্ধুদ্ধ করেছি, সেখান থেকেই শুরু। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০-৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি, এরমধ্যে শুধু তাল গাছের বীজই রয়েছে প্রায় ২৫-৩০ হাজার। আসলে নানা কারণে সব গাছ টিকিয়ে রাখতে পারিনি। ওমরপুর ইউনিয়নের বাউল সড়ক ছাড়াও আরও চারটি সড়কে গাছ লাগিয়ে যাচ্ছি ও পরিচর্যা করি। বর্তমানে নিজের নার্সারিতে চারা উৎপাদনে সময় দিতে পারি না ফলে ঝালকাঠির স্বরুপকাঠি থেকে বিভিন্ন গাছের চারা কিনে আনি।
তিনি বলেন, গত বেশ কয়েকবছর ধরে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে, তাই আগামীতে বজ্রপাত থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে তালের বীজ ও চারা লাগানোর ওপর জোর দিয়েছি। মাঝেমধ্যে বন বিভাগ থেকে পরামর্শ নিই। আমি সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গাছ লাগাই, গাছ লাগানোর কথা এবং উপকারের কথা আল্লাহ পবিত্র কুরআনেও বলেছেন। আল্লাহর রাসুলও গাছ লাগানোর প্রতি উদ্ধুদ্ধ করেছেন।
Manual2 Ad Code
তিনি আরও বলেন, আমার লক্ষ্য হচ্ছে গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। গাছ চিত্ত বিনোদনের জন্যেও উপকারী, মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে ও পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
একটি গাছ লাগানো মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক ছায়া, সৌন্দর্যবর্ধন, নিরাপদ অক্সিজেনের একটি স্থায়ী উৎস তৈরি করা। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিনই চলবে আমার এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
যুবসমাজের উদ্দেশে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, চিত্ত বিনোদনের জন্য ফল ও ফুলের বাগান গড়ে তোলার মাধ্যমে খারাপ অভ্যাস থেকে ফিরে আসা সম্ভব। নিজেদের জীবনের কথা চিন্তা করে গাছ লাগালে ইহকাল ও পরকালের জন্য ভালো হবে। এ ছাড়া সবাইকে বেশি বেশি গাছ লাগানো ও পরিচর্যার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন বলেন, রেজাউল করিম হুজুরের লাগানো তালগাছ বর্তমানে ফলন দিচ্ছে। আমাদের বাউল গ্রামের রাস্তার দুধারে শতশত তালগাছ, যখন এ সড়ক দিয়ে আমরা যাই মনে হয় গেটের ভেতরে দিয়ে যাচ্ছি। গাছগুলোর জন্য রাস্তার সৌন্দর্য বেড়েছে। আমরা নিজেরাও বিকেলে এবং সন্ধ্যার পরে এখানে সময় কাটাই, অনেক দূর থেকেও মানুষ আসে। হুজুরের গাছ লাগানো দেখে আমরাও সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর না হোক নিজেদের জমিতে হলেও বেশি করে গাছ লাগাবো।
এদিকে ইমাম রেজাউল করিমর নিজস্ব উদ্যোগে চলা এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ। তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে তার পাশে দাঁড়াবো।
প্রায় তিন যুগ ধরে নীরবে-নিভৃতে চলা রেজাউল কিবরিয়া বাবুল হুজুরের এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রকৃতিপ্রেম এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশে সবুজায়নের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।