জুলাই জাতীয় সনদ এবং নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী পাস হলে দেশের রাষ্ট্রপতি পদটি আর আলঙ্কারিক থাকবে না। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি হওয়ায় ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠার পথও রুদ্ধ হতে পারে। আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এই নতুন রাষ্ট্রপতিই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। এ কারণে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, সেদিকেও দৃষ্টি রয়েছে সবার। আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ‘আমরা জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ জন্য আমরা শুধুমাত্র জুলাই জাতীয় সনদই নয়, জুলাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলের মতামত নিয়েই সংবিধান সংশোধন করব। জুলাই সনদেই শুধু নয়, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সংবিধানের এই সংশোধনীর জন্য একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে।’
Manual1 Ad Code
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ সম্মতিতে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দল বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারের মূল ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নিশ্চিত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বা সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। এই আইনি কাঠামোর কারণে কার্যত প্রধানমন্ত্রী একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হন। যার ফলে বিচার বিভাগ ও অন্যান্য স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়ে।
Manual3 Ad Code
‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেগুলো হলোÑ রাষ্ট্রপতি কোনো প্রকার প্রধানমন্ত্রীর আগাম সুপারিশ ছাড়াই দেশের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াচডগ বা তদারকি প্রতিষ্ঠান যেমনÑ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, আইন কমিশন এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য সরাসরি নিয়োগ করতে পারবেন। এই নিয়োগগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি একটি স্বাধীন অনুসন্ধান বা সার্চ কমিটির সুপারিশ করা যোগ্যতার তালিকার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। দেশের সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রধান নিয়োগের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির নিজস্ব এখতিয়ারে রাখার কথা বলা হয়েছে।
Manual5 Ad Code
এ জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)-এর সংশোধনী আনয়নের কথা বলা হয়েছে। বিএনপির ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ের রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারে সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ৬-এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন করা হবে।’ সেখানে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেওয়া না হলেও জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হলে রাষ্ট্রপতি পদটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ তখন দেশের প্রধান প্রধান সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সংসদীয় বাছাই কমিটির শুনানি শেষে রাষ্ট্রপতি সরাসরি নিয়োগ কার্যকর করবেন, যা এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বকে খর্ব করবে। প্রতিরক্ষা, বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন এবং তদারকি সংস্থাগুলোর প্রধানদের জবাবদিহিতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করার কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির পর্যালোচনা অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদ এবং বিএনপির ইশতেহারের মূল দর্শন একইÑ প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতার লাগাম টানা। তবে কাঠামোগত ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। জুলাই সনদে যেখানে সরাসরি নির্দিষ্ট কিছু স্বাধীন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির তাৎক্ষণিক ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে, বিএনপির ইশতেহারে তা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় কাঠামো ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির শুনানির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা শুধু বৃদ্ধিই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা খর্বও করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের এখতিয়ার সম্পর্কে বলা হয়েছে, সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে তিনি উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সংশ্লিষ্ট আইনে এরূপ বিধান রাখা হবে যে, এরূপ কোনো আবেদন বিবেচনার পূর্বে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করা হবে।
রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে, রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।