প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

বিচারপতি সংকটে আপিল বিভাগ, রেকর্ড মামলাজট

editor
প্রকাশিত আগস্ট ৬, ২০২৬, ০১:২০ অপরাহ্ণ
বিচারপতি সংকটে আপিল বিভাগ, রেকর্ড মামলাজট

Manual1 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারক সংকট বিরাজ করছে, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ মামলাজট। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরসহ সংশ্লিষ্ট মহল থেকে দ্রুত বিচারপতি নিয়োগের অনুরোধ জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। মূলত এর মাধ্যমেই সর্বোচ্চ আদালতের এই সংকটের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বর্তমানে মাত্র চারজন বিচারপতির একটি একক বেঞ্চের মাধ্যমে আপিল শুনানি ও রায় প্রদান করা হচ্ছে। বিচারক স্বল্পতার কারণে একাধিক বেঞ্চ গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই একক বেঞ্চের ওপরই চাপ বাড়ছে এবং দীর্ঘায়িত হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা। এরপরও কেন বিচারক সংকট, কেন নিয়োগ হয়নি আপিল বিভাগের বিচারপতি এবং করণীয় কীÑ এ নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ।

 

Manual3 Ad Code

মামলা বেড়েছে ৭ গুণ, বিচারক কমেছে অর্ধেকেরও বেশি

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি মামলা। মার্চের পর কিছু মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, আবার নতুন মামলাও যোগ হয়েছে। ফলে এই সংখ্যায় তারতম্য হতে পারে।

আইনজীবীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ও মামলার অনুপাতের তুলনায় বিচারকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। ১৯৭২ সালে মাত্র ৪ জন বিচারপতি নিয়ে আপিল বিভাগ যাত্রা শুরু করেছিল, তখন বিচারাধীন মামলা ছিল ৪ হাজার ৫৬টি। ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং সে সময় বিচারাধীন মামলা ছিল মাত্র ৫ হাজার ২৬০টি। অথচ ২০২৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩১ হাজার ১২০টিতে। বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৭১৩। অর্থাৎ, ২০০৯ সালের তুলনায় মামলার সংখ্যা প্রায় ৭ গুণ বাড়লেও বিচারকের সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

সংকটের প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ১০ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও আইনজীবীর বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের ৬ জন বিচারপতি পদত্যাগ করেন। এরপর ১২ আগস্ট রাতে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে চারজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চে আপিল বিভাগে আরও ২ জন নতুন বিচারপতি নিয়োগ পান।

সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম চলতি বছরের ১৫ জুলাই এবং বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান। বর্তমানে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ মাত্র ৪ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে নতুন করে কোনো বিচারক নিয়োগ হয়নি।

Manual1 Ad Code

নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার কারণ

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, বিচারক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা দায়ী। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং প্রধান বিচারপতিসহ ১৭ জন বিচারক রাজনৈতিক চাপে বা তদন্তের মুখে পদত্যাগ করা ও অপসারিত হওয়ার কারণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে ২০২৫ সালের শুরুতে একটি স্বতন্ত্র বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করা হলেও, চলতি বছর এপ্রিলে সংসদ ওই অধ্যাদেশ ও বিলটি বাতিল করে দেয়। ফলে বিচারক নিয়োগের জন্য বর্তমানে সুনির্দিষ্ট আধুনিক কোনো আইন নেই এবং প্রক্রিয়াটি আবারও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এই প্রতিবেদককে বলেন, সংবিধানে প্রধান বিচারপতির সাথে পরামর্শের কথা বলা থাকলেও, মূলত নির্বাহী বিভাগই বিচারকদের নাম চূড়ান্ত করে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক যোগ্যতার চুলচেরা বিশ্লেষণের কারণে এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়।

আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করেন, হাইকোর্ট বিভাগ থেকে জ্যেষ্ঠ ও দক্ষ বিচারপতিদের আপিল বিভাগে পদোন্নতি দেওয়া হলে হাইকোর্টে বিচারকাজ স্থবির হওয়ার একটি আশঙ্কা থাকে, কারণ সেখানেও চরম মামলাজট ও বিচারক সংকট রয়েছে।

ঝুলে আছে চাঞ্চল্যকর মামলা

বিচারক সংকটের কারণে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা, মেজর সিনহা হত্যা মামলা, হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদের জালিয়াতি ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মতো অসংখ্য জনগুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে।

সংবিধানে যা আছে

Manual4 Ad Code

সংবিধানে আপিল বিভাগের বিচারকের কোনো নির্দিষ্ট বা সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া নেই। বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৪ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের প্রতিটি বিভাগে যতজন প্রয়োজন মনে করবেন, ততজন বিচারক নিয়োগ দিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাকসুদ উল্লাহ বলেন, ‘একটি বেঞ্চ দিয়ে আপিল বিভাগের বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এতে মামলাজট কমবে না। অচিরেই বিচারক সংখ্যা বাড়িয়ে ন্যূনতম দুটি বা তারও বেশি বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে। সংবিধানে ৩ থেকে ৪টি বেঞ্চ গঠনে কোনো বাধা নেই।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘বিচারপতি সংকট অনেক দিন ধরেই চলছে। উচ্চ আদালতে মাত্র একটি বেঞ্চ খুব বেশি কাজের চাপে থাকে, তারা চাপমুক্তভাবে কাজ করতেও পারছেন না। চেম্বার জজ আদালতে একজন জাজ সিভিল এবং ক্রিমিনাল শুনানি করেন এবং আরেকজন জাজকে দিয়েছেন রিট শুনানির দায়িত্ব, এখানেও কাজের চাপ বেশি হয়ে গেছে।’

Manual3 Ad Code

সংকট সমাধানের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগের জন্য অন্তত তিনটি বেঞ্চ হতে হবে। বহু বছর ধরে এমন তিনটা বেঞ্চ ছিল। ১১ জন পর্যন্ত আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ হয়েছিল। এটা করলে বেঞ্চগুলো সুচারুভাবে বিচার কাজ করতে পারবেন। বিচার প্রার্থীরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে যাচ্ছে। তবে ১১ জন বিচারক দিয়ে আপিল বিভাগ পরিচালিত হলে মসৃণ বিচার আশা করা যায়।’ তিনি আরও বলেন, হাইকোর্ট থেকে যাচাই-বাছাই করে খ্যাতিমান আইনজীবীদের সরাসরি আপিল বিভাগে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্ট ও রাষ্ট্রপতির কাছে তবে প্রকৃত অর্থে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এখানে গুরুত্ববহ বলে জানান তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ‘আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের বিষয়টি মূলত সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বিচারকদের মধ্য থেকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দিয়ে সরকার দ্রুততম সময়ে এই সংকটের সমাধান করতে পারে। ন্যূনতম ৮ থেকে ১১ জন বিচারক না হলে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এই আদালতের মামলাজট বাড়তেই থাকবে। সরকারের এ বিষয়ে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার আশিকুল খবির ২৯ জুলাই বলেন, ‘আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের দপ্তরে নির্দেশনা আসলে, এ বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

আইনি সংস্কারের অংশ হিসেবে বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রতিরোধে প্রাথমিক যাচাই ব্যবস্থা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code