‘কালো আইন’ হিসেবে পরিচিত বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় ‘আটকাদেশ’ (ডিটেনশন) দিয়ে যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত চর্চায় লাগাম টানতে যাচ্ছে সরকার। এখন থেকে চাইলেই যৌক্তিক কারণ ছাড়া কাউকে হুটহাট আটকাদেশ দেওয়া যাবে না। প্রতিটি আটকাদেশের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহি। এ ছাড়া নির্দিষ্ট ১২০ দিন মেয়াদের পর কাউকে আটকে রাখতে হলে নবগঠিত তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা বোর্ডের সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ ক্ষমতা আইনে দেওয়া আটকাদেশের যৌক্তিকতা যাচাই ও দেখভাল করতেই সরকার এই বোর্ড গঠন করেছে।
Manual1 Ad Code
চলতি বছরের ১৫ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তিন সদস্যের এই উপদেষ্টা বোর্ড গঠনের কথা জানানো হয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল। অপর দুই সদস্য হলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এর আগে ২০২৫ সালের ৩ জুলাই জারি করা এ বিষয়ক প্রজ্ঞাপনটি রহিত করা হয়েছে।
বিতর্ক এড়ানোর উদ্যোগ
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, আটকাদেশ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা বিতর্ক এড়াতেই এই উদ্যোগ। তার ভাষায়, ‘বোর্ড প্রতিটি আটকাদেশ পর্যালোচনা করবে। ১২০ দিনের বেশি কাউকে আটকে রাখার প্রয়োজন হলে বোর্ডের সুপারিশ লাগবে। বর্তমান সরকার অযাচিত বিতর্ক এড়াতে ও আটকাদেশের যৌক্তিকতা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক আটকের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে ছয় মাসের বেশি আটকে রাখা যায় না। এর বেশি সময় আটকে রাখতে হলে উপদেষ্টা বোর্ডের সন্তোষজনক প্রতিবেদন প্রয়োজন হয়।
প্রেক্ষাপট ও বর্তমান চিত্র
গত বছরের ১২ এপ্রিল বিশেষ ক্ষমতা আইনে মডেল মেঘনা আলমকে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ২০২০ সালে ‘মিস আর্থ বাংলাদেশ’ বিজয়ী মেঘনাকে কোনো নির্দিষ্ট মামলা ছাড়াই আটক করায় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সে সময়কার এক বার্তায় জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে মিথ্যাচার ছড়ানোর মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক অবনতির অপচেষ্টার অভিযোগে তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে।
২০০৪ সালের পর থেকে এ ধরনের নিবর্তনমূলক আটকাদেশের প্রয়োগ বেশ কমে এসেছিল বলে আদালত-সংশ্লিষ্টরা মনে করলেও, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মেঘনা আলমসহ প্রায় ৩৭ জনকে এই আইনের আওতায় আটকাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে চারজন নারী ছিলেন। মেয়াদের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেকে মুক্তি পেলেও কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহার হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের কারাগারে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৬ জন আটক রয়েছেন।
Manual3 Ad Code
ডিটেনশন আইন ও এর প্রয়োগ
ডিটেনশন বা আটকাদেশ হলো কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিনা বিচারে আটকে রাখা। এটি মূলত বিচারিক ও প্রতিরোধমূলকÑ এই দুই ধরনের হয়ে থাকে।
Manual7 Ad Code
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রবিরোধী ক্ষতিকর কাজ থেকে নিবৃত্ত রাখতে সরকার যেকোনো ব্যক্তিকে আটকের আদেশ দিতে পারে। জেলা বা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার এই আদেশ দিতে পারেন। প্রাথমিকভাবে ৩০ দিন এবং পরে ৯০ দিনসহ মোট ১২০ দিন একজন ব্যক্তিকে বিনা বিচারে আটকে রাখা যায়। এই মেয়াদ পেরোলেই প্রয়োজন হয় উপদেষ্টা বোর্ডের সুপারিশ। দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করা, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন কিংবা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধের যুক্তিতে এই আইনের প্রয়োগ করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদ্বেগ ও বিশেষজ্ঞ মত
স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পাস হওয়া এই আইনের ৫০ বছরে অপপ্রয়োগ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সব সরকারের আমলেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনটি ব্যবহার করা হয়েছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ বিষয়ে বলেন, ‘আইনটি প্রণয়নের পর প্রথম ৩০ বছরে অন্তত ৩০ হাজার থেকে দুই লাখ মানুষকে এর আওতায় আটকাদেশ দেওয়া হয়েছিল বলে আমরা একটি ধারণা পেয়েছিলাম। যদিও এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের কঠোর অবস্থানের কারণে এই প্রবণতা কিছুটা কমে আসে।’
আইনটি কেন বাতিল করা হচ্ছে নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে শাহদীন মালিক বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ বা বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সরকারকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হয়। অপরাধ সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায় না। এ কারণেই বিশেষ ক্ষেত্রে আইনটির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এমন আইন আছে। তবে গণতান্ত্রিক দেশে এর অপপ্রয়োগ হয় না, যা আমাদের দেশে বরাবরই হয়েছে।’