প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৭শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

প্রাথমিকের প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা লুটপাট!

editor
প্রকাশিত আগস্ট ১০, ২০২৬, ০৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
প্রাথমিকের প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা লুটপাট!

Manual7 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পে স্বাক্ষর-সিল জালিয়াতি ও চুক্তি মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে মাত্র একটি জেলায় চুক্তি মূল্যের বাইরে ৪০ কোটি টাকার বেশি বিল পেয়েছেন ঠিকাদাররা। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। অথচ এই বাড়তি টাকা ফেরত যায়নি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। অর্থ ফেরত আসবে কি না, সেটিও জানেন না প্রকল্প পরিচালক। খোদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন বাকি জেলাগুলোতেও একইভাবে অর্থ তসরুপ করা হয়েছে। এভাবেই এই প্রকল্পের অনিয়ম হাজার কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

শুধু শরীয়তপুরে এই প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে ওয়াশ ব্লক নির্মাণকাজের ৪১২টি প্যাকেজে। এই খাতে কাজের চুক্তি মূল্যের বাইরে ৩৮ কোটি ৪০ লাখ ৫১ হাজার টাকা চুক্তি মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনে ৫২টি প্যাকেজে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৭৯ হাজার টাকা অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারকে চুক্তি মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্টরাও অবাক হয়েছেন। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নীতি এখানে সরাসরি উপেক্ষা করা হয়েছে। পিপিআর বিধিবহির্ভূতভাবে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করার দায় কোনো পক্ষই এড়াতে পারে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

শরীয়তপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের (ডিপিএইচই) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, ‘অতিরিক্ত বিল দেওয়া যায়। ঠিকাদার বেশি কাজ করলে ও অনেক কাজের উচ্চতা বেশি হলে বিল দেওয়া যায়। আমি কোনো সমস্যা দেখি না।’

Manual3 Ad Code

‘চাহিদাভিত্তিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প (১ম পর্যায়)’-এর প্রাক্কলিত মোট ব্যয় ৮ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। ১০ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে কক্ষ নির্মাণ, শিক্ষকদের বসার কক্ষ, শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চ, সীমানাপ্রাচীর, আসবাবপত্র, ডিপ টিউবওয়েল, পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়েছে।

Manual6 Ad Code

এদিকে শরীয়তপুর জেলার সদর উপজেলায়ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করে ওয়াশ ব্লক ও ডিপ টিউবওয়েল হস্তান্তর করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফারুক মণ্ডল ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক এবং ৪১টি ডিপ টিউবওয়েল হস্তান্তরে শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলামের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করেছেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা পরে তাজুল ইসলামের নমুনা স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। পরে ওয়াশ ব্লক ও ডিপ টিউবওয়েল হস্তান্তর সার্টিফিকেটের স্বাক্ষর যাচাই করে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ডিপিএইচইকে ব্যবস্থা নিতে প্রকল্প পরিচালক নির্দেশনা দেন।

অথচ উপসহকারী প্রকৌশলী ফারুক মণ্ডল জালিয়াতি করার পরও তার বিরুদ্ধে ডিপিএইচই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি বিষয়টি আমলেও নেওয়া হয়নি। ডিপিএইচইর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, ‘ফারুক মণ্ডলের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেব। তার স্ত্রী অসুস্থ। তিনি এখন দেশের বাইরে আছেন।’

শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘একটি ওয়াশ ব্লকের নির্মাণ খরচ ১৫ লাখ টাকা। ডাবল ওয়াশ ব্লকের খরচ ২০ লাখ টাকা। অন্তত ১৬টি ওয়াশ ব্লক করা হয়েছে আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে। আর ডিপ টিউবওয়েল কোথায় লাগিয়েছে তা আমিও জানি না।’

একই রকম জালিয়াতি ঘটেছে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায়। এখানে জালিয়াতি করেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহাবউদ্দীন খান। তিনি চেবেকা পাঠান, স্বর্ণখোলা, উদয়তারা ও তেলিপাড়া হাই সংযুক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হস্তান্তর সার্টিফিকেট জালিয়াতি করেছেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ্ মো. ইকবাল মনসুরের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করে হস্তান্তর করেছেন। এ ছাড়া বাড়ৈইপাড়া, বানাদেশ, ভূমখাড়া এবং চাকষ, গুলমাইজ আব্বাসিয়া, লোনসিং ভূঁইয়াবাড়ি, মধ্যে গুলমাইজ, নগর, নলতা, পালের চর, পশ্চিম লোনসিং এবং সুরেশ্বর, চরআত্রা, চরমোহন সুরেশ্বর, দিনারা এবং গাগ্রীজোড়া সরকারি প্রাথমিকের প্রাচীর নির্মাণ ও হস্তান্তরে জালিয়াতি করেছেন। যে কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব প্রাচীরের কাজ শিক্ষা অফিস গ্রহণ করেনি।

Manual8 Ad Code

সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহাবউদ্দীন খান বর্তমানে অবসরজনিত ছুটিতে আছেন। তিনি বলেন, ‘এটি অনেক দিন আগের কথা। আমাদের মধ্যে একটি ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল। পরে সমাধান হয়েছে। আমার ডিপার্টমেন্ট থেকেও তদন্ত হয়েছে। শুনেছি, রিপোর্টও দেওয়া হয়েছে।’

শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ্ মো. ইকবাল মনসুর বলেন, ‘এটি ২০২২ সালের ঘটনা। কিন্তু চার বছর পর কেন আবার চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেটি বুঝতে পারছি না।’

Manual3 Ad Code

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চাহিদাভিত্তিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্ম সচিব আলমগীর খন্দকার বলেন, ‘চলতি বছরের জুন মাসে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। ৪০ কোটি টাকার বেশি এই অর্থ আর ফেরত আসেনি। আমি প্রাথমিক অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানিয়েছি। তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলেছেন। মন্ত্রণালয় আবার স্থানীয় সরকারকে জানিয়েছে। এর পরের খবর আর আমার জানা নেই।’ যারা স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং বিল নিয়েছেন ও দিয়েছেন তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ কী? এমন প্রশ্নেও তিনি কিছুই বলতে পারেননি।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য মো. আবু ইউসুফ মিয়া বলেন, চুক্তি মূল্যের চেয়ে এক টাকা বেশি অর্থ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান এই অর্থ দিলে তারা দায়ী থাকবে। চুক্তি মূল্যের চেয়ে কোনো ঠিকাদার বেশি কাজ করলেও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে যে মূল্য রয়েছে সেটিই থাকবে। বেশি কাজ করতে হলেই পুনঃদরপত্র ডাকতে হবে। এর দায়ভার কোনোভাবেই প্রকল্প পরিচালক এড়াতে পারেন না। তিনি অডিট আপত্তির মুখে পড়বেন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code