বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নতুন এ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আসবে। পাশাপাশি জাল পাসপোর্ট-ভিসা শনাক্তকরণ, ই-পাসপোর্টের ডিজিটাল স্বাক্ষর যাচাই, বোর্ডিং ব্রিজ পরিচালনায় বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও সনদ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সেবার মান নির্ধারণ এবং বিমানবন্দর এলাকায় অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা চালুর মতো একাধিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) মানদণ্ড অনুসরণ এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক অডিটের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
Manual6 Ad Code
গত বৃহস্পতিবার বেবিচক আয়োজিত জাতীয় বিমান চলাচল সহজীকরণ কমিটির (এনএটিএফসি) সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানমের সভাপতিত্বে প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মন্ত্রণালয়ের সচিব, বেবিচকের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স
ভিআইপি-ইকোনমি ক্লাসের নিরাপত্তায় পার্থক্য থাকবে না : সভায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভিআইপি ও সাধারণ যাত্রীর মধ্যে কোনো পার্থক্য না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, ‘আইকাও অডিটের ফলাফলের সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি সরাসরি জড়িত। তাই সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণ ও ঘাটতিগুলো সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।’
একক নয়, সমন্বিত নিরাপত্তাকাঠামো : বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কোনো একটি সংস্থার একক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বেবিচক, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে দায়িত্ব নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে একাধিক সংস্থা যাতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সেজন্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রায় তিন বছর পর অনুষ্ঠিত এই সভায় বিমানবন্দরের প্রবেশপথের নিরাপত্তা জোরদার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়ই
Manual4 Ad Code
Manual6 Ad Code
আকাশসীমায় অ্যান্টি-ড্রোন
বিমানবন্দর এলাকার আকাশসীমা সুরক্ষায় অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সভায় প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ বিষয়ে উদ্যোগের কথা জানান। সভায় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও স্ক্যানার পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের আশপাশে অননুমোদিত ড্রোনের ব্যবহার উড়োজাহাজ চলাচল ও নিরাপত্তার জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে।
Manual3 Ad Code
হালনাগাদ হচ্ছে নিরাপত্তানীতি
জাতীয় বিমান পরিবহন সহজীকরণ কর্মসূচি (এনএটিএফপি) হালনাগাদের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এজন্য বেবিচকের সদস্যের (নিরাপত্তা) নেতৃত্বে একটি বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে। এই গ্রুপ বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনা করবে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সেগুলোর সামঞ্জস্য যাচাই করবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব দেবে। বিমানবন্দর পরিচালনায় বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব ও পারস্পরিক সমন্বয়ের বিষয়ও পর্যালোচনার আওতায় থাকবে।
বোর্ডিং ব্রিজে প্রশিক্ষণ ও সনদ বাধ্যতামূলক
বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজ পরিচালনায় সামান্য ভুলেও উড়োজাহাজের ক্ষতি, যাত্রী নিরাপত্তা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই বোর্ডিং ব্রিজ পরিচালনায় মানবিক ভুলের ঝুঁকি নিয়ে সভায় আলোচনার মাধ্যমে অপারেটরদের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অপারেটরদের শুধু প্রশিক্ষণ নয়, দক্ষতা যাচাই করে সনদ দেওয়ার জন্য একটি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। মূল্যায়নের সময় যন্ত্র পরিচালনার দক্ষতার পাশাপাশি নিরাপত্তা এবং সুরক্ষাকেও বাধ্যতামূলক সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এসব পদক্ষেপের ফলে এ ক্ষেত্রে দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
জাল ভ্রমণ নথিতে কঠোর নজর
জাল ভ্রমণ নথির ব্যবহার অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ভুয়া পাসপোর্ট, জাল ভিসা ও অন্যান্য প্রতারণামূলক ভ্রমণ নথি শনাক্ত ও প্রতিরোধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোনো নথি সন্দেহজনক বা জাল হিসেবে শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের হাইকমিশন বা দূতাবাসকে জানানো হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো হবে।
সভায় আইকাও’র ট্রাভেলার আইডেন্টিফিকেশন প্রোগ্রাম (ট্রিপ) রোডম্যাপ বাস্তবায়ন এবং পাবলিক কি ডিরেক্টরি (পিকেডি) ব্যবস্থায় কার্যকর অংশগ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পিকেডির মাধ্যমে ই-পাসপোর্টের ডিজিটাল স্বাক্ষর আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করা সম্ভব। তাই জাল ই-পাসপোর্ট শনাক্ত করতে ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বাড়বে জবাবদিহি
বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের প্রতিটি ধাপও উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ কারণে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার মান নিশ্চিত করতে সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
সহজ হচ্ছে ব্যাগেজ ঘোষণা
যাত্রীসেবা সহজ করতে ব্যাগেজ ডিক্লারেশন ফরমের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বিমানের ভেতরেই ছাপানো ফরম সরবরাহ, ওয়েবসাইটে ডিজিটাল সংস্করণ রাখা এবং সহজে হার্ডকপি পাওয়ার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে এ ব্যবস্থা চলতি মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা সভায় জানানো হয়েছে।
অডিটের আগে প্রস্তুতি, সামনে বাস্তবায়নের পরীক্ষা
এনএটিএফসি সভার সিদ্ধান্তগুলোর বড় একটি অংশই আন্তর্জাতিক অডিটের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আইকাও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিমান চলাচল, নিরাপত্তা, সহজীকরণ ও পরিচালনব্যবস্থার বিভিন্ন দিক মূল্যায়ন করে। সেই মূল্যায়নে দেশের সক্ষমতা ও ঘাটতি দুটিই উঠে আসে। তাই নীতিমালা হালনাগাদ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিনিময় এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বÑ সবকিছুকে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাকাঠামো শুধু নতুন সরঞ্জাম কেনার মাধ্যমে তৈরি হয় না। নীতিমালা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রযুক্তি, তথ্য বিনিময় এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বিত প্রয়োগই একটি কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। তবে এসব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি আগের সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা পর্যালোচনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, আধুনিক স্ক্যানার, পিকেডি, বোর্ডিং ব্রিজ অপারেটরদের প্রশিক্ষণ কিংবা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের এসএলএÑ প্রতিটি উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর। সব মিলিয়ে এনএটিএফসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
নতুন পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি যাত্রীসেবার মান এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক অডিটে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতায়ও আসতে পারে দৃশ্যমান পরিবর্তন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সিদ্ধান্তের তালিকা নয়Ñ মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়নই বলে দেবে, দেশের বিমানবন্দর নিরাপত্তাব্যবস্থায় এই উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর পরিবর্তন ঘটিয়েছে।