জরুরি প্রয়োজনে সহজে ঋণ পাওয়ার আশায় মোবাইল অ্যাপের দ্বারস্থ হয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অল্প সময়ের মধ্যে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ফোনবুক, ছবি, খুদে বার্তা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে অননুমোদিত বিভিন্ন অ্যাপচক্র।
পরে ঋণের বিপরীতে অস্বাভাবিক সুদ ও বিভিন্ন ধরনের চার্জ দাবি করা হয়। টাকা পরিশোধ করতে দেরি হলে গ্রাহক এবং তাঁর পরিচিতদের ফোন করে ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
শাহীন হোসেন একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। গত জুন মাসে মুঠোফোনের একটি অ্যাপ থেকে তিন ধাপে তিনি ছয় হাজার টাকা ঋণ নেন।
এক মাস মেয়াদের ওই ঋণ পরিশোধ করতে তাঁকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। অর্থাৎ মূল ঋণের ওপর তাঁকে চার হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে।
শাহীন হোসেন বলেন, অতিরিক্ত টাকা দাবি করায় এক পর্যায়ে তিনি তা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দেওয়া হয়, মুঠোফোনে থাকা তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে আত্মীয়-স্বজনের নম্বরে ফোন করা হবে। হয়রানির আশঙ্কায় পরে তিনি টাকা পরিশোধ করে দেন।
শাহীন যে অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছিলেন, সেটির নাম ‘ফিনক্যাশ’। বাংলাদেশে এ ধরনের অন্তত ৩০টি অ্যাপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম চালালেও অনুমোদিত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের পরিচয় নেই।
Manual1 Ad Code
ঋণের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের আবেদন করতে গেলে প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, মোবাইল নম্বর এবং বিকাশ-নগদসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবার তথ্য দিতে হয়। অ্যাপ ইনস্টলের পর ফোনবুক, ছবি, ভিডিও, খুদে বার্তা ও অবস্থানের তথ্য ব্যবহারের অনুমতিও চাওয়া হয়। অনুমতি না দিলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণের আবেদন সম্পন্ন করা যায় না।
ঋণ পাওয়ার পর শুরু হয় আরেক ধরনের চাপ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে গ্রাহককে ফোন করে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর ফোনবুকে থাকা পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা সাঈদ মিয়া। তিনি এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ঈদুল আজহার আগে জরুরি প্রয়োজনে কয়েকটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা না পেয়ে তিনি ফেসবুকে একটি ঋণের বিজ্ঞাপন দেখে অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করেন। পরে তিনি মোট ২৪ হাজার টাকা ঋণ নেন। কিন্তু এক সপ্তাহ পরই অ্যাপে সুদসহ তাঁর বকেয়া দেখানো হয় ৮১ হাজার টাকা। তিনি ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। বাকি অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর পরিচিত ব্যক্তিদের ফোন করা এবং ভয়ভীতি দেখানোর হুমকি দেওয়া হয়।
Manual1 Ad Code
৩০টির বেশি অ্যাপের কার্যক্রম
ফেসবুকের বিজ্ঞাপন ও গুগল প্লে স্টোরের তথ্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশে ঋণ কার্যক্রম চালানো অন্তত ৩০টি অ্যাপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব অ্যাপের মধ্যে রয়েছে সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওনজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী ও লোনহাট।
অনেক ক্ষেত্রে সুপরিচিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নাম বা পরিচিতির সঙ্গে মিল রেখে এসব অ্যাপের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘সাথী লোন’ নামের অ্যাপ ব্যক্তি পর্যায়ে বছরে ১৮ থেকে ২৬ শতাংশ সুদে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রস্তাব দিচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গুগল প্লে স্টোরে আসা অ্যাপটি এরই মধ্যে এক লাখের বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘কুইক লোন’ নামের একটি অ্যাপ ১৮ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা ঋণের প্রস্তাব দিচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্লে স্টোরে আসা অ্যাপটি পাঁচ লাখের বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে।
এসব অ্যাপ পরিচালনাকারীদের অনেকেরই নির্দিষ্ট কার্যালয় বা ঠিকানা নেই। ফলে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
দেশে বৈধ ঋণের বড় বাজার
দেশে বৈধভাবে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অনুমোদিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে ব্যাংক ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ২০২৪ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণের স্থিতি ছিল দুই লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান অ্যাপের মাধ্যমে ঋণসেবা দিচ্ছে। ব্র্যাক ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের অ্যাপভিত্তিক ঋণসেবা রয়েছে। এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশের মাধ্যমেও ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
Manual2 Ad Code
তবে বৈধ ঋণসেবার বাইরে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত ও সহজে ঋণ পাওয়ার যে চাহিদা রয়েছে, সেটিকেই কাজে লাগাচ্ছে অননুমোদিত অ্যাপগুলো। অনুমোদন ছাড়া ঋণ বিতরণ এবং নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর্থিক সেবার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা আইনসিদ্ধ নয়।
সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘অ্যাপভিত্তিক ঋণ প্রতারণা ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে সবকিছুর আগে সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করছে এবং ব্যাংকগুলোকে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যাংক প্রতারককে শনাক্ত করতে পারলে তাৎক্ষণিক দেশের অন্য ব্যাংকগুলোকে জানানোর নির্দেশনা রয়েছে। তবে অ্যাপভিত্তিক সব কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে নেই। এ ধরনের অননুমোদিত কার্যক্রম বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ভারতে বন্ধ হয়েছে হাজারো অ্যাপ
বাংলাদেশে অ্যাপভিত্তিক প্রতারণা এখনো ব্যাপক আকার ধারণ না করলেও প্রতিবেশী ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে অবৈধ ঋণ অ্যাপের কার্যক্রম ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ভারতে সরকারি উদ্যোগে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক অবৈধ ঋণ অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত ১২ আগস্ট এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন পর্যন্ত ভারতে তিন হাজার ৭১৮টি অ্যাপ বন্ধ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতারণা বড় আকার ধারণ করার আগেই অননুমোদিত অ্যাপ শনাক্ত ও বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি অ্যাপ স্টোর ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব অ্যাপের বিজ্ঞাপন বন্ধ, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার ঠেকানো এবং প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।