সরকারের প্রথম ছয় মাসে বাজার ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও সরবরাহব্যবস্থায় একগুচ্ছ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার, টিসিবিকে ডিজিটাল করা, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড চালু, নতুন অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ, উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নজরদারির ব্যবস্থা এবং বাজারে হাজারো অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি এবং নতুন রফতানি বাজার খোঁজার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির সূচকেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও বাজার পরিস্থিতি মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এলেও রাজধানীর বাজারে ডিমের ডজন ১৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা, মিনিকেট চাল ৭৮ টাকা এবং অনেক সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। বরং লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের কারণে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে।
সরকারের ছয় মাসপূর্তির পরদিন মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, জীবনযাত্রার বর্তমান ব্যয় নিয়ে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন। তবে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সরকার দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বলে দাবি করেন তিনি। দাম কমাতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ঋণের সুদ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন ও অবকাঠামোর উন্নতির প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যই সরকারের ১৮০ দিনের বাজার ব্যবস্থাপনার একটি মূল্যায়ন—পরিস্থিতি কিছু সূচকে আগের চেয়ে ভালো হলেও সন্তুষ্ট হওয়ার মতো নয়।
মন্ত্রণালয়ের খাতায় অনেক কাজ
বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রগতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ২০২টি গন্তব্যে ৮১২ ধরনের পণ্য রফতানি করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৩টি পণ্য ও সেবা খাতে ৩ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও পাটজাত পণ্যকে নতুন রফতানি খাত হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
Manual6 Ad Code
বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। এলডিসি উত্তরণের পর বাজারসুবিধা ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও কাজ চলছে। আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬ থেকে ২০২৯ প্রণয়নের কাজও চলছে।
এসব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন। কিন্তু একজন সাধারণ ক্রেতার কাছে মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের দৃশ্যমান মাপকাঠি জাপান বা কোরিয়ার বাজার নয়; তার পাশের বাজারে চাল, ডাল, তেল, ডিম ও সবজির দাম। সেই জায়গায় সরকারের ১৮০ দিনের সফলতা ও ব্যর্থতার ফলাফল মিশ্র বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূল্যস্ফীতিতে ‘স্বস্তি’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে নেমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও দ্রুত কমে ৮ দশমিক ৬০ থেকে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। জুলাইয়ের সার্বিক মূল্যস্ফীতি গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সরকারের জন্য এটি ইতিবাচক খবর। কারণ প্রথম কয়েক মাস পরিস্থিতি ছিল উল্টো দিকে। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এরপর ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল ও মে মাসে আবার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মে মাসে তা ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে ওঠে। জুনে কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং জুলাইয়ে তা আরও কমে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমা মানে বাজারদর কমে যাওয়া নয়। জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হওয়ার অর্থ হলো, খাদ্যের সামগ্রিক দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এখনও বেশি। শুধু দাম বাড়ার হার স্থিতিশীল হয়েছে।
Manual1 Ad Code
তবে ১৮ আগস্টের বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ ক্রেতারা স্বস্তিতে নেই। দ্রব্যমূল্য নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও সন্তুষ্ট নন। সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশেও দৃশ্যমান বড় কোনও পরিবর্তন বা উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ‘দ্রব্যমূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধি সংক্রান্ত সাপ্তাহিক প্রতিবেদন’ প্রকাশিত রয়েছে। অর্থাৎ সরকার নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারের ওঠানামা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু একই সময়ে রাজধানীর বাজার পরিস্থিতি স্বস্তির ছিল না।
ব্রয়লার মুরগি ও সোনালিসহ সব মুরগির দাম বেড়েছে। ডিমের ডজন ১৫০ টাকা। মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫, বিআর-২৮ প্রায় ৬০, মিনিকেট ৭৮ এবং কাটারি নাজির ৮৫ টাকা কেজি। সবজির দাম কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে। কাঁচামরিচে অবশ্য সরকারের আমদানি ও সরবরাহ বাড়ানোর সুফল দেখা গেছে।
আয় আর ব্যয়ের পার্থক্য অনেক
বাজার পরিস্থিতি বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক মজুরি। নিম্ন আয়ের একজন শ্রমিকের নামমাত্র আয় সূচক অনুযায়ী বাড়লেও পণ্য ও সেবার দাম বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চললে পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে।
Manual1 Ad Code
এ কারণে শুধু মূল্যস্ফীতির হারকে বাজার ব্যবস্থাপনার সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড ধরা যথেষ্ট নয়। সাফল্যের আসল পরীক্ষা হলো মানুষের আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য কেনা যাচ্ছে কি না।
Manual7 Ad Code
‘সিন্ডিকেট’ থেকে এখন সরবরাহব্যবস্থায় নজর
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ছয় মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সরকারের শুরুর দিকে ‘সিন্ডিকেট’, কারসাজি ও বাজার তদারকির ওপর বেশি জোর ছিল। এখন বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেই সমস্যাটিকে আরও কাঠামোগতভাবে ব্যাখ্যা করছেন।
৩০ জুলাই সিপিডির এক আলোচনায় তিনি জানান, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন, অবকাঠামো ও বাজারের অনিয়ম খাদ্যের উচ্চমূল্যের পেছনে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সিপিডির গবেষণাতেও সমস্যার গভীরতা উঠে এসেছে। তাদের হিসাবে উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায়ে কাঁচামরিচের দাম বাড়ে ১১৬ শতাংশ। মাঝারি চাল প্রায় ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজ ৮৭, মসুর ডাল ৭৮, বেগুন ৭২ এবং আলু ৫০ শতাংশ। তুলনায় ছোট সরবরাহশৃঙ্খলে ডিমে ব্যবধান ২৫ এবং মুরগিতে ২২ শতাংশ।
সিপিডির হিসাবে কৃষক পর্যায়ে এক কেজি পাইজাম চালের গড় মূল্য ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা। ব্যবসায়ী, মিলার ও পাইকারের হাত ঘুরে সেই চাল খুচরায় পৌঁছায় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়।
এই ব্যবধান শুধু মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে নয়; পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ দুর্বলতা, অপচয়, বাজারে তথ্যের ঘাটতি, সরবরাহ সংকট এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে মজুত ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ—সবকিছু মিলেই দাম বাড়ে বলে সিপিডির পর্যবেক্ষণ।
‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ২০২৬’
মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের অগ্রগতি তালিকায় বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে পুরোনো ১৯৫৬ সালের আইন বদলে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ২০২৬’ করার উদ্যোগের কথা রয়েছে।
শেষ চার মাসে ৫ হাজার এবং পরবর্তী দুই মাসে আরও আড়াই হাজার বিশেষ বাজার তদারকি অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে। টিসিবিকে ডিজিটাল করা, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ও বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং সরবরাহে স্বচ্ছতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
টিসিবির সংস্কার ভালো, তবে বাজারের বিকল্প নয়
বিশ্লেষকরা মনে করেন, টিসিবিকে আধুনিক করা এবং স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ। ভর্তুকি সঠিক মানুষের কাছে গেলে উচ্চমূল্যের চাপ কিছুটা সামলানো যায়। তবে টিসিবি দিয়ে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
টিসিবি মূলত নিম্ন আয়ের নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে পারে। দেশের কোটি কোটি ভোক্তার জন্য স্থায়ী সমাধান হলো প্রতিযোগিতামূলক বাজার, কম পরিবহন ব্যয়, পর্যাপ্ত মজুত, দ্রুত আমদানি সিদ্ধান্ত এবং কৃষক থেকে বাজার পর্যন্ত দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা।
তাই সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের দ্রব্যমূল্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত মূল্যায়ন হতে পারে—সরকার ব্যর্থতার জায়গা থেকে কিছুটা বেরিয়েছে, কিন্তু সাফল্যের জায়গায় এখনও পৌঁছায়নি। মূল্যস্ফীতির সূচকে স্বস্তির শুরু হয়েছে; বাজারে সেই স্বস্তিকে স্থায়ী করার কাজ বাকি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ নাকি সফল, সেটা বলবো না। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি, এখনও দেখছি না। যেসব ব্যবসায়ী নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছে, তাদেরও তো সরকার ডেকে কিছু বলেনি।’