দেশের উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি সহায়তা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্ধ শিল্প-কারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এসব কর্মসূচির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
সরকারের পরিকল্পনায় চলমান কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, কৃষি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বন্ধ শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করা। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে আবারও উৎপাদন শুরু : বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) লিজ দেওয়া ১৭টি পাটকলের মধ্যে ৯টিতে এরই মধ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এতে নতুন করে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের।
আরো তিনটি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর প্রক্রিয়া চলছে। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আরো প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সঙ্গে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস ও খুলনার স্টার জুট মিলস এবং হ্যামকো গ্রুপের সঙ্গে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলসের ইজারা চুক্তি হয়েছে। এসব মিলে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
মিলগুলো চালু হলে বার্ষিক সম্ভাব্য আয় দাঁড়াবে প্রায় এক হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া চট্টগ্রামের এমএম জুট মিল, রাঙ্গুনিয়ার কেএফডি লিমিটেড ও নরসিংদীর কো-অপারেটিভ জুট মিল লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার ২০২০ সালে বিজেএমসির পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়। চলতি বছর বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব বন্ধ মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। মূলত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতিকে গতিশীল করা ও অব্যবহৃত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তাই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) পদ্ধতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে মিলগুলো লিজ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যবহার বাড়াতে সরকার বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে। পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। এর ফলে দেশে পাটের ব্যবহার বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমে আসবে। এতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘পাটের ব্যবহার সম্প্রসারণে জুট ডাইভার্সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) কাজ করছে। সরকারিভাবে প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে পাটপণ্যের প্রদর্শনী আয়োজন, হস্তশিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’
চলতি অর্থবছরে আরো ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড : এদিকে চলতি অর্থবছরে দেশের ৪০ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড এবং ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডও দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলায় গড়ে আট থেকে ১০ হাজার পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আসতে পারে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি নাগাদ এসব কর্মসূচির সুফল মানুষের কাছে আরো ব্যাপক পরিসরে পৌঁছবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুবিধাভোগী পরিবারগুলো সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসবে।
এ প্রসঙ্গে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘সারা দেশে মাস্টার ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। নভেম্বরের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ শেষ করে একযোগে সারা দেশে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য সংগ্রহ ও তদারকির জন্য প্রায় ৭২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক মাঠে নামানো হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওয়ার্ডভিত্তিক পুরো এলাকা একসঙ্গে কাভার করা হবে, যাতে তথ্য সংগ্রহে কোনো ঘাটতি বা পুনরাবৃত্তি না থাকে।’
তিনি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরেই আমাদের লক্ষ্য পূরণ হবে। আমরা সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি।’
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ৪৩ লাখ কৃষক। উদ্বোধনী পর্যায়ে ৫৬ জেলার ৭৭ উপজেলার ৭৭টি কৃষি ব্লকের এক লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষক কৃষি উপকরণ সহায়তা পাবেন। প্রথম দিনই প্রায় এক লাখ কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হবে। এরই মধ্যে সাড়ে ১৯ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা বাড়ানো হবে। প্রত্যেক উপকারভোগী বছরে একবার দুই হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। এই সুবিধা শুধু ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য প্রযোজ্য। মাঝারি ও বড় কৃষক আপাতত এই কর্মসূচির আওতায় থাকছেন না।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য দেশব্যাপী দুই কোটি ৪০ লাখ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা।’
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী চার বছরে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাশয় খনন-পুনঃখননের লক্ষ্য রয়েছে। এ বছর এরই মধ্যে ১১০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাসে ৩৭৭ কিলোমিটার খনন-পুনঃখননের কাজ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬০ কিলোমিটার। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে ১৭ কিলোমিটার বেশি কাজ হয়েছে বলে জানা গেছে।
Manual5 Ad Code
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, ‘চলতি বছর এরই মধ্যে ১১০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাসে ৩৭৭ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।’
এ ছাড়া ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত ও মন্দিরের সেবায়েতদের পর্যায়ক্রমে সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ ধরনের সুবিধা প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নে কৌশলগত পরিকল্পনা : জানা যায়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে জনবল বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগের প্রশাসনের সময়কার জনবল দিয়েই বর্তমানে কাজ চালাতে হচ্ছে। নতুন নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে সময় প্রয়োজন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অনাগ্রহ, অনিচ্ছা ও হতাশার মতো বিষয় রয়েছে। সরকার এসব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে এবং কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনে আরো সক্রিয় হবেন এমনটাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো উন্নয়ন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। খুন, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
Manual4 Ad Code
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। পরিস্থিতির আরো উন্নয়নে কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জনগণের সহযোগিতায় এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আরো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
Manual3 Ad Code
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, পুলিশ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিযান ও অন্যান্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জুলাই-পরবর্তী সময়ে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে বাহিনীকে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করার উপযোগী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিয়ে তিন পরিকল্পনা : জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে এলএনজি টার্মিনাল উন্নয়ন, নতুন গ্যাসকূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি এবং পেট্রোবাংলার সক্ষমতা জোরদার করা। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি কূপের কাজ হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও শুরু হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া উদ্যোগ আছে। সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশে কর-সুবিধা, প্রণোদনা এবং স্বল্প সুদের ঋণের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি অফিস-আদালতে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলায় সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অব্যবহৃত সরকারি ও অকৃষি জমি ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারি জমি ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে।
Manual1 Ad Code
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানিসংকট সমাধানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।