নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেট মহানগরীর রায়নগরে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে ২০ দিনের প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে তাঁর প্রেমিক বাবুল মিয়া একাই তিনজনকে হত্যা করেছেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধারে অভিযান চালালেও এখন পর্যন্ত সেটি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে সিলেট মহানগরীর রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় খুন হন ওই বাসার মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)।
Manual3 Ad Code
জানা যায়, বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে প্রতিবেশীরা বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে সন্দেহ করেন। পরে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজার তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। পরবর্তী সময়ে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলোকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে প্রেরণ করা হয়। ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। এটি ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো বিরোধ-এমন একাধিক সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
ওই দিনেই সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেখানে পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন মোটিভ সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। দ্রুত রহস্য উদঘাটনে বিশেষ তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
Manual8 Ad Code
তদন্তের শুরুতেই বাসার আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লাল টি-শার্ট ও মাথায় ক্যাপ পরা এক ব্যক্তিকে সন্দেহ হয় তদন্তকারীদের। এরপর তাঁর পরিচয় শনাক্তে শুরু হয় অনুসন্ধান। স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যেই রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনি থেকে নূর মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বাবুল মিয়া তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি বাসার পাশের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরে ওই ছুরি উদ্ধারে অভিযান চালায় পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত ছুরিটি পাওয়া যায়নি।
Manual7 Ad Code
পুলিশ জানায়, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে বাবুল মিয়ার ২০ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকালে তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় যান বাবুল। তাহমিনার সম্মতিতেই তিনি বাসায় প্রবেশ করেন তিনি। একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেন। তাহমিনা এতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাবুলের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাহমিনার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম ছুটে আসলে তখন তাঁকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা। এরপর চিৎকারের শব্দ শুনে মো. আব্দুস সাত্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করে বাবুল। তিনজনকে হত্যার পর ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে বাসার বেলকনি দিয়ে বেরিয়ে যান বাবুল। পরে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি বাসার পাশের জঙ্গলাকীর্ণ একটি মাঠে ফেলে দেন বলে পুলিশকে জানান তিনি। এরপরও তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাননি, বরং রায়নগর এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নানা প্রশ্ন তৈরি হলেও সিসিটিভি ফুটেজ এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তে দ্রুত গতি আসে। সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি অনুসরণ করে ঘটনার মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। বাবুল মিয়া পেশায় রঙ মিস্ত্রি। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজও করতেন। কসাইয়ের কাজের সুবাদে তাঁর কাছে থাকা ছুরিটিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।